Agaminews
Dr. Neem Hakim

মুকুটহীন সম্রাটের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষা ও সমসাময়িক ভাবনা


বার্তাকক্ষ প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ৬, ২০২১, ১১:৫১ অপরাহ্ন /
মুকুটহীন সম্রাটের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষা ও সমসাময়িক ভাবনা

স্বীকৃতি বিশ্বাস যশোর

যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত ২২ ফেব্রুয়ারী ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত ভারত বর্ষের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার হিসাবে খ্যাত চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বাহাড়ের কোলঘ্যাসা বরমা ইউনিয়নে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পিতা যাত্রা মোহন সেনগুপ্ত ছিলেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আইনজীবি ও বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য ছিলেন।

যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত ১৯০২ সালে হেয়ার স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন।১৯০৪ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিলেত গমন করেন।১৯০৮ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. এবং ১৯০৯ সালে ব্যারিস্টারি পাশ করেন। শিক্ষা জীবনে ইংরেজ মহিলা নেলী গ্রে-এর সাথে আলাপ হয় এবং প্রনয় হয়।বিবাহ ব্ন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর নাম হয় নেলি সেনগুপ্তা। নেলি সেনগুপ্তাও ছিলেন অসামান্য সমাজকর্মী ও দেশ প্রেমিক রাজনৈতিক নেত্রী হিসাবে ভারতে সমুজ্জ্বল।
তিনি ব্যরিস্টারি পাশ করার পর ১৯১০ সালে কলকাতা হাইকোর্টে যোগ দেন এবং আইনজীবী হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হন। এরই মধ্যে কিছু দিন রিপন কলেজ অাধুনা সুরেন্দ্র নাথ আইন কলেজে আইনের শিক্ষকতা করেন।
অগ্নিযুগের বহু বিপ্লবীকে নিশ্চিত ফাঁসির হাত থেকে রক্ষা করেন। ১৯২৩ সালে দ্বিতীয় আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সাতজন বিপ্লবী মুক্ত হন। স্বইচ্ছায় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পক্ষ নিয়ে আদালতে লড়াই করতেন।
১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে আইনজীবীর পেশা ত্যাগ করেন। বর্মা অয়েল কোম্পানি ও আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে ধর্মঘট পরিচালনার দায়ে সস্ত্রীক কারাদণ্ড হয়। ভারতে শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এই ধর্মঘট ছিল সর্বপ্রথম বৃহত্তর ধর্মঘট এবং ধর্মঘটীদের পরিবার প্রতিপালনের জন্য সেই যুগে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নেন। সাধারণ জনগণ তাঁকে দেশপ্রিয় উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ গ্রহনকারী সশস্ত্র বিপ্লবীদের প্রতি ছিলেন সহনাভূতিশীল। জনদরদী এই মানুষটিকে চট্টগ্রামের মানুষ মুকুটহীন রাজা হিসাবে ভূষিত করেন।
১৯৩০ সালে ভারত থেকে বর্তমান বার্মাকে বিচ্ছিন্ন করার প্রতিবাদে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য গ্রেফতার করেন।
১৯২২ থেকে ১৯২৩ সালে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং সভাপতি ছিলেন। পরে অবশ্য দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন-এর স্বরাজ্য পার্টিতে যোগ দেন। পাঁচ বার কলকাতার মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের মৃত্যুর পরে প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সমিতির সভাপতি হন।চট্টগ্রামের ভূমি পুত্র হিসাবে নানা ধরনের সামাজিক কর্মকান্ডে অবদান ছিল অন্যন্য। চট্টগ্রামের ভয়াবহ বন্যা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও হাঙ্গামার সময় ত্রাণকার্যের পুরোভাগে ছিলেন।
মাস্টারদা,সূর্য সেন,অনন্ত সিংহ,অম্বিকা চক্রবর্তীর হয়ে মামলা পরিচালনা করে কারামুক্ত করেন।বস্তুতঃ চট্টগ্রাম বিদ্রোহের বহু সৈনিককে ফাঁসির হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন।ফৌজদারি বিষয়ে তাঁর সমকক্ষ আইনজ্ঞ ও বক্তা ভারতে কমই ছিল। তিনি সশস্ত্র বিপ্লবীদের সাথে প্রত্যক্ষ যোগদানকারী ও মদদদাতা হওয়ায় বিভিন্ন সময় অন্তরীণ হয়ে উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে ২৩ জুলাই ১৯৩৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
অবিভক্ত ভারতবর্ষের এই সূর্য সন্তানের স্মৃতি বিজড়িত

চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জের প্রায় ২০০ বছরের পুরাতন বাড়িটি রাজনৈতিক প্রভাবশালীর লোলুপ দৃষ্টি পড়ে ফলে ঐতিহাসিক ও স্মৃতি বিজড়িত প্রাচীন স্থাপনাটি ভেঙে ফেলার কার্যক্রম শুরু করে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্তসহ অনেকেই প্রতিবাদে সামিল হন।
ঐতিহাসিক ও অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের স্মৃতি বিজড়িত এই নিদর্শন রক্ষার্থে দলমত নির্বিশেষে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান হয়।
এরই পরিপেক্ষিতে বিট্রিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত যাত্রা মোহন সেনগুপ্তের বাড়ির দখল ও অবস্থানের উপর স্থিতাবস্থা জারি করেছেন মহামান্য হাইকোর্ট। ফলে ঐতিহাসিক বাড়িটি যে অবস্থায় আছে, ঠিক সেই অবস্থায় থাকবে। জনস্বার্থে করা রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানিতে বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মোঃমোঃ খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ এই আদেশ দেন।
শুধু তাই নয়, যাত্রা মোহন সেনগুপ্তের ঐতিহাসিক বাড়িটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসাবে সংরক্ষণ করার ব্যর্থতাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং ঐ স্থাপনাকে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসাবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি মাসুদ আলম চৌধুরী হাইকোর্টে এই রিটটি দায়ের করেন।
সময়োপযোগী এই আদেশের জন্য মহামান্য হাইকোর্টকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

দলমত নির্বিশেষে সকলের ঐক্যবদ্ধ সম্মিলিত প্রতিবাদই পারে যেকোনো ধরনের অপশক্তির হাত স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক স্থাপনাই শুধু নয় যেকোনো ধরনের অন্যায়,অত্যাচার ও অবিচার থেকে রক্ষা করতে।