Agaminews
Dr. Neem Hakim

আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাবার লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলবো


বার্তাকক্ষ প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ২৬, ২০২০, ২:০৯ অপরাহ্ন /
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাবার লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলবো

ডা. আসিফ শুভ্র

এভাবে আর কতোদিন ? ডক্টর ! আপনি কি বলেন ?
যেই জিনিসের কোন ফেইট বা outcome নেই , তার পিছে ছোটা টা বোকামী না ? “
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম ।

আহসান সাহেবের ছেলে তার বাবার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে নির্বিকার ভাবেই কথা গুলো বলছিলেন। আমি আহসান সাহেবের বেড মনিটরের দিকে তাকালাম। পালস ছিলো 93 beats / min. হঠাৎ করে সেটা বেড়ে 150 beats/min এ গিয়ে দাঁড়ালো। আহসান সাহেবের নিশ্বাস এর ( respiratory rate ) গতি ও হঠাৎ বেড়ে গেছে ।

মানে ওনার ব্রেন তাঁর নিজ সন্তানের কথা গুলো ট্রেস করতে পারছেন । কি বলছে তাঁর নিজ সন্তান ?

এই অনুভূতির কথা কি চিকিৎসা বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারবে ? হ্যাঁ ! আহসান সাহেব কোমায় অাছেন ঠিকই, তাঁর ব্রেন তো ঠিকই সব কথা ধরতে পারছে , নিজ সন্তান আজ তাঁকে আজ অথর্ব মনে করছে । তাঁর পিছে অর্থ খরচ করাটাকে অপচয় মনে করছে যদিও তাঁর সন্তানের পক্ষে তাঁর চিকিৎসার ব্যায় বহন করার মতো সামর্থ্য আছে ।

” ডক্টর, আপনি নিশ্চয়তা দিন ! যে বাবা সুস্থ্ হবে , তাহলেই আমি ট্রিটমেন্ট কন্টিনিউ করবো। তাছাড়া আর একমুহূর্ত ও না। এভাবে টাকা জলে ফেলার কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছিনা। আজকে চারদিন বাবা আইসিইউতে। কোন ইমপ্রুভমেন্ট ই তো নাই। ”
আমি নিশ্বাস ফেললাম একটা ।

” দেখুন হাসনাত সাহেব। আপনার বাবার ব্রেন স্টেম ইনফ্রাকশান ( brainstem infarction ) উনার হার্ট সচল , উনি লাইফ সাপোর্টে আছেন। কোমাতে আছেন ঠিকই , তবে ওঁনার এখনো ব্রেন ডেথ হয়নি। অর্থাৎ আপনার পিতার ব্রেন এখনো অনুভূতি গ্রহন করতে পারছেন । আপনার আমার কথোপকথন ও বুঝতে পারছেন। আমি কেনো, পৃথিবীর কোন চিকিৎসক ই নিশ্চয়তা দিতে পারবেন না , আপনার পিতা আর কতোদিন বাঁচবেন… তবে আমি আপনাকে এটুকু বলতে পারি , আপনি যদি এখন লাইফ সাপোর্ট উইথড্র করেন – উনি কষ্ট পেয়ে মারা যাবেন। উনি ভেন্টিলেটর মেশিন দিয়ে শ্বাস নিচ্ছেন। ভেন্টিলেটর উইথ ড্র করলে উনি শ্বাস নিতে পারবেন না। শ্বাসকষ্টে মারা যাবেন আপনার বাবা । আপনার সামর্থ্য থাকলে আপনি আরো কয়েকটা দিন ট্রিটমেন্ট কন্টিনিউ করেন, প্লিজ …….! ”
—” ও ! আচ্ছা !!!
তার মানে আপনি , আপনার প্রফেসর রা কেউই নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না! ”
–” জ্বী না । ”
—” তাহলে খুলে ফেলুন লাইফ সাপোর্ট মেশিন । কোথায় সাইন করতে হবে বলেন । সাইন করে দিচ্ছি । এভাবে আর টাকার শ্রাদ্ধ করতে পারবো না । ”
আমি কথা বাড়ালাম না ।

মনিটরে তাকিয়ে দেখলাম আহসান সাহেবের হার্ট রেট বাড়ছেই , ভেন্টিলেটরে অ্যালার্ম বাজছে, মানে আহসান সাহেব ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছেন। হয়তো বুঝতে পারছেন তাঁর আদরের সন্তানটা নিজ হাতে কিছুক্ষন পরেই তাঁর নিশ্বাস নেবার যন্ত্রটা খুলে ফেলতে সম্মতি দেবে ।

যা ভেবেছিলাম তাই ই হলো।
এতো বুঝানোর পরও লাইফ সাপোর্ট উইথ ড্র করার সম্মতিপত্রে সাইন করলো হাসনাত সাহেব।
—” ডক্টর ! মৃত ঘোষণা করতে আর কতক্ষণ সময় লাগবে ? ”
আমি বোবার মতো চুপ করে রইলাম । কি বলবো ?
শুধু বিড়বিড়িয়ে বললাম -” আমাকে ঘন্টা দুয়েক সময় দিন প্লিজ। লাইফ সাপোর্ট একবারে উইথ ড্র করতে চাচ্ছি না। আস্তে আস্তে উইথ ড্র করি। এতে আপনার বাবার কষ্ট কম হবে ”
–” ডক্টর শুনুন । বাবার ডেথ সার্টিফিকেট টা কিন্তু আমার হাতে দিবেন । বাবার ইনসুরেন্স আছে তো ! ”
আমি কথা বাড়ালাম না ।
আমার একটা তীব্র কষ্টের অনুভূতি হচ্ছে বহুদিন পর।
আমি আইসিইউ থেকে সব ভিজিটর বের করে দিলাম ।
চুপ করে আহসান সাহেবের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম ।
100 % অক্সিজেন থেকে কমিয়ে কমিয়ে 80…..70…….60…….% করছি।

আহসান সাহেবের চোখে পানি।
মানুষটা কোমায় আছে ঠিকই ……. অনুভূতি তো মরেনি , অশ্রুগ্রন্থিও সচল ।
হয়তো উনি ফিরে গেছেন আজ থেকে তিরিশ বছর আগের কোন স্মৃতিতে ।
তখন তাঁর একমাত্র পুত্র হাসনাতের বয়স মাত্র দুই বৎসর । বাবা ! বাবা ! বলে ডাকতে শিখেছে ছেলেটা। হাসনাত সাহেব দিনরাত পরিশ্রম করছেন …. তাঁর একটাই স্বপ্ন , হাসনাতের যাতে কোন কষ্ট না হয় । যতো কষ্ট সব আমি ই করবো। অফিস থেকে ফিরে হয়তো চিৎকার করে ডাকতেন –
” বাবা ! হাসনাত …..! কোথায় আমার লক্ষীসোনা ? আসো বাবা !
বাবার বুকে আসো ….! ”
ছোট্ট হাসনাত ও হয়তো একলাফে বাবার বুকে উঠে চুপ করে বসে থাকতো ।
হয়তো তখন বিড়বিড়িয়ে আহসান সাহেব বলতেন –
” হাসনাত ! বাবা আমার ! তোকে অনেক বড় হতে হবে ! মানুষের মতো মানুষ হতে হবে …..! বাবার অনেক কষ্ট হয় রে চাকরী করতে ! সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনী বাবার ! তারপর ও যখন তোকে বুকে নেই …. মনে হয় তুই একদিকে আর বাকী দুনিয়া অন্যদিকে…..! ”

আমি সরে চলে আসলাম । স্ক্রীন দিয়ে ঢেকে দিলাম আসলাম সাহেবের বিছানা। আমি দূরে চুপচাপ বসে আছি ।
আমরা চিকিৎসক রা আসলেই বড্ড অসহায় !
দূর থেকে মনিটর টা দেখা যাচ্ছে । আসলাম সাহেবের হার্ট রেট কমে আসছে । 60…..55…….40……..35………..20…….15………….

পৃথিবীর চাওয়া না পাওয়ার জটিল সমীকরণের কাছে , অর্থের কাছে হার মেনে যাচ্ছে পিতা পুত্রের রক্তের টান , ছেলেবেলার ঘুমপাড়ানির গান , বাবার কাঁধে মাথা দিয়ে ঘুমানোর সেই অপূর্ব মুহূর্ত