Agaminews
Dr. Neem Hakim

ভবদহের করালগ্রাসে বিলুপ্তির পথে লোক সঙ্গীত ” শুবরে গান “


বার্তাকক্ষ প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ২১, ২০২০, ১২:৩০ পূর্বাহ্ন /
ভবদহের করালগ্রাসে বিলুপ্তির পথে লোক সঙ্গীত ” শুবরে গান “

স্বীকৃতি বিশ্বাস স্টাফ রিপোর্টারঃ

বাংলা লোকসাহিত্যের সমৃদ্ধি সর্ব্বজন বিদিত। লোক সাহিত্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ লোক সঙ্গীত। আর এই লোক সঙ্গীত বাংলাদেশের সঙ্গীতের একটি অন্যতম ধারা।

এটি মূলতঃ গ্রামবাংলার নিজস্ব কথা ও সুরের সমাহার, যেখান গ্রামবাংলার কৃষক, মাঝি, গাড়িয়াল, রাখালসহ সমগ্র গ্রাম্য মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আশা-নিরাশার কথা গানের মাধ্যমে ফুটে ওঠে। এসব গানের অনেক ভাগ আছে। এটি একটি দেশের অঞ্চল ভিত্তিক কৃষ্টি- কালচার ফুটে ওঠে।বাংলাদেশের ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, গাজীর গান, গম্ভীরা গানের সাথে সমগ্র দেশের মানুষ সুপরিচিত। কিন্তু বৃহত্তর যশোর জেলার অভয়নগর, মনিরামপুর,কেশবপুর,ডুমুরিয়া, ফুলতলার বৃহদাংশে গ্রাম বাংলার সুমধুর সুরের মুর্ছনা নিয়ে অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে শুবরে গানের প্রচলন।

শুবরে গানের বৈশিষ্ট্যঃ ১.পূর্বে যখন অত্র এলাকার লোক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল তখন মৌখিক ভাবে লোকসমাজে প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে যখন এলাকায় শিক্ষার বিস্তার ঘটল তখন থেকে লিপিবদ্ধ করে রাখা শুরু হয়।
২. শুবরে গান এককভাবে ও সম্মিলিতভাবে গাওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিশোর- কিশোরীরা এ গান গায়। প্রত্যেক গ্রামে দু’একটা দল থাকত।
৩. সাধারণত স্বশিক্ষিত নিরক্ষর মানুষের রচনা ও সুরে এ গান গাওয়া হয়।
৪. গানের কথায় আঞ্চলিকতার প্রভাব থাকে।
৫.প্রকৃতি,মধ্যযুগীয় রাধাকৃষ্ণ, ধনও ধানের দেবীর গুণগান ও পূজাঅর্চনার বিষয় সংশ্লিষ্ট।
৬.গানের মধ্যে দৈনন্দিন জীবনের সুখদুঃখ প্রকাশ পায়।
৭. শুবরে গান সাধারণতঃ সন্ধ্যা থেকে যতক্ষণ কৃষাণ- কৃষাণীরা ধান মাড়াইয়ের কাজ করে ততক্ষণ পর্যন্ত গাওয়া হয়।
৮.শুবরে গান সাথে ধানের সাথে সম্পৃক্ত। পূর্বে পৌষ মাসে কৃষকের ঘরে ধান উঠত তখন ধান কেটে গোলায়( ধান রাখার ঘর বা লক্ষীর ঘর) ভরে রাখত। তারপর বাস্তপূজা দিয়ে নতুন ধানের পিঠাপুলির তৈরি করে খাওয়া হতো যা পৌষ পার্বন নামে পরিচিত।
৯. শুবরে গানের ভিতরেও গ্রাম্য জীবনের সহজ-সরল জীবন ধারার বর্ণনা পাওয়া যায়।

শুবরে গানের কথাঃ
“ভাইরে, শুনো সবে ভক্তি ভাবে করি নিবেদন
রাধাকৃষ্ণের কথা কিছু শুনো দিয়ে মন…”

” ভাইরে শুন সবে ভক্তি ভাবে করি নিবেদন,
নদের চাঁদের কথা কিছু করিবো বর্ণন,
কলি কালের কথা কিছু রাখিও স্মরণ,
নদের চাঁদ কুম্ভির হইল নারীর ও কারণ…”
………….
এভাবে অন্যান্য গানের সুরছন্দ তাললয় যুক্ত।
সুবরের প্রত্যেকটি গানের শেষের কলিতে সাধারণতঃ এটুকু গাওয়া হতো —
এক খুচি( ধান গোলায় তোলার পাত্র)ধান্য দিবে মাথায় করে লবো,

সেই খুচি ধান্য বেচে( বিক্রি) মোরা বাস্তরে( লক্ষী) ফুল দেবো।
ভাইরে শুন সবে ভক্তি ভাবে করি নিবেদন,
— — —

শুবরে গানের বর্তমান প্রেক্ষাপটঃ
আশির দশক থেকে অত্র অঞ্চলে ভবদহ নামক স্লুইসগেটের কারনে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি।আর জলাবদ্ধতার কারনে কৃষকেরা ধান উৎপন্ন করতে পারেনা। তাই আমন কাটার মরশুমে আমাদের উঠোন আর আগের মতো ধান পলে ভরা থাকেনা, থাকেনা কৃষকের চোখেমুখে নবান্নের আনন্দ। সুর তাল নাচগান ভুলে গেছে জলাবদ্ধতার অভিশাপে।
অভয়নগর মনিরামপুর, কেশবপুর,ডুমুরিয়া, ফুলতলা নিয়ে ৯৬ গ্রামের বিস্তার। মূলতঃ ৯৬ গ্রামে শুবরে গানের প্রচলন ছিল। একসাথে দলবেঁধে শুবরে গান হত।পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামেগ্রামে শুবরে গানের দল থাকত। ক্লান্ত কৃষকের উৎপাদিত ধান যখন ঘরেবাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত পৌষ পার্বনের অনুষ্ঠানে মুখরিত থাকত সমগ্র এলাকাময়। উঠোনে আমন ধান,আকাশ ছোঁয়া পলের গাদায়( ধানের গাছ যা গোখাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়) হেলান দিয়ে কৃষকের বৌ- মেয়েরা শুবরে গান শুনতো আর গান শুনে মুগ্ধ হয়ে দুহাত উজাড় করে ধান দিত। বাড়িতে বাড়িতে বাস্তুপূজা (পৈতৃক ভিটেমাটি আর বাড়ির মঙ্গল কামনায় বাস্তুদেবী’র/ বাস্তুদেবতা’র যে পূজা) হতো। পূজার পর নতুন ধানের পিঠাপুলি খেত। উক্ত অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করে মেয়েজামাইদের নিয়ে আসত।

যে সব কিশোর – কিশোরী বা যাদের গানের দল থাকত তারা শুবরে গান গেয়ে পাওয়া ধান বিক্রি করে বনভোজন করত। উদ্বৃত্ত টাকা দিয়ে ফুটবল বা নেট বল কিনে গ্রামের বা পাড়ার ছেলেরা মাঠে খেলত।যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করত।
এসবই এখনকার প্রজন্মের কাছে গল্পের মত। এখন ভবদহের জলাবদ্ধতার কারনে বছরের পর বছর ফসলও হয় না আর শুবরের গানও গাওয়া হয় না।

শুবরে গান বাংলা লোকসংগীতের একটা বিরাট ভাণ্ডার। কালের বিবর্তনে শুবরে গান হারাতে বসেছে।এ গানে