Agaminews
Dr. Neem Hakim

ডিসেম্বরের এই দিনে-


বার্তাকক্ষ প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ৪, ২০২০, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন /
ডিসেম্বরের এই দিনে-

স্বীকৃতি বিশ্বাস।

উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই
নিঃশেষে প্রাণ, যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।

বাংলাদেশের জনগণ হয়তো শুনতে পেরেছিলেন কারো কথা তাই হয়তো অকুতোভয় হয়ে বুকে বল সঞ্চার করে দেশের জন্য জীবন দিয়ে শহীদ হওয়ার ব্রত নিয়েছিলেন। তাই বাংলাদেশকে স্বাধীন করার নিমিত্তে
৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে ভিত্তি রচনা করেছিলেন। তারপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে (কাল রাত) জনগণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু করেন।১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া স্বাধীনতা সংগ্রামে গ্রীষ্মের দাবাদহকে আলিঙ্গন করে বর্ষার অঝোর ধারা পেরিয়ে শরতের স্নিগ্ধ সুষমাকে হৃদয়ে ধারন করে শীতের হাড়কাঁপানো ঠান্ডাকে উপেক্ষা করে বাংলার দামাল সন্তানেরা দেশ মার্তৃকার সেবায় নিজেদেরকে উজাড় করে দিয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর শনিবার দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাক-হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদর আলশামসদের সম্মূখ যুদ্ধে পাক-হানাদার বাহিনী ও তার দোসরদের পরাজয়ের খরব আসতে থাকে। ডিসেম্বরের এ দিন দখলদার মুক্ত হয়-দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, গাইবান্ধার ফুলছড়ি, দামুড়হুদা, জীবননগর, বকশীগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরসহ আরও কিছু এলাকা।

ডিসেম্বরের হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যে কোন শীত নেই মুক্তিকামী বীর বাঙালির। একাত্তরের রক্তঝরা এই দিনে চারিদিকে বীর বাঙালির বিজয়, আর পাকহানাদার বাহিনীর পরাজয়ের খবর। দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যুদস্ত হতে থাকে উর্দুভাষী হানাদার বাহিনী । দেশের বিভিন্ন অঞ্চল মুক্ত হতে থাকে। সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে আকাশে, বাতাসে- সর্বত্র। সেই বিজয়ের বার্তা যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের করে তোলে আরো প্রাণবন্ত।ফলে দুর্বার ওঅপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলে স্বাধীনতা অর্জনের বিজয় নিশান।মুক্তিযোদ্ধাদের অনমনীয়, তেজোদ্বীপ্ত অগ্রগতির কাছে সমস্ত বাধাই তুচ্ছ মনে হতে লাগলো । মূলতঃ ডিসেম্বর মাসের প্রতিটি দিনই শত্রুর পরাজয়ের ক্ষণ গণনা মুহূর্ত চলছিল। এক একটি দিন রচিত হচ্ছিল বাঙালির বীরত্বগাঁথার নতুন নতুন ইতিহাস।
১৯৭১-এর এদিন থেকেই শুরু হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বাত্মক যুদ্ধ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তারা মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সঙ্গে রয়েছে ভারতীয় মিত্র বাহিনী। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী চারদিক দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। দুই বাহিনী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে থাকে। পায়ের তলার মাটি সরে যেতে থাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ।
৩ ডিসেম্বর তারিখে ( শুক্রবার)ভারতে আক্রমণ চালিয়ে বিপাকে পড়ে যায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। এ আক্রমণের মাধ্যমে তারা চেষ্টা করেছিল মুক্তিযুদ্ধের গতি ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দিতে। বিশ্ববাসীকে বোঝাতে চেয়েছিল এটা ভারতীয় আগ্রাসন। আর ভারতের আগ্রাসন থেকে বাঁচতে তারা এই আক্রমণ পরিচালনা করেছে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকরা নিজেরাই ফেঁসে যায়। তাদের এই অলীক গল্প বিশ্বের কেউ আমলে নেয়নি। রাতে দেয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বেতার ভাষণে বাংলাদেশের প্রতি তার সমর্থন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। পূর্ব পাকিস্তান আর দখলে রাখা যাবে না এবং মুক্তিবাহিনী যে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে সেটা পাকিস্তানিরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল। রণাঙ্গনগুলোতে ক্রমেই পরাস্ত হচ্ছিল পাকিস্তানি হানাদাররা।

এই বাস্তবতা সামনে রেখে পাকিস্তানিরা আরেক যুদ্ধে মেতে উঠে। সেই যুদ্ধ স্নায়ুযুদ্ধ। আন্তর্জাতিক এই স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয় জাতিসংঘে। পাকিস্তান চেয়েছিল এই যুদ্ধকে পাক-ভারত যুদ্ধ হিসেবে দেখিয়ে নিজেদের সুবিধা হাতিয়ে নিতে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাজে লাগিয়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।আর তাদের ধারনা ছিল যুদ্ধ থামাতে পারলে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রগতি রোধ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গ তখন দুর্বল হয়ে পড়বে। একাত্তরের এই দিনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের অনুরোধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উপস্থাপন করে। এ প্রস্তাবে দাবি করা হয়- এ মুহূর্তে ভারত ও পাকিস্তানকে নিজ নিজ সীমান্তের ভেতর সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন এই প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। বৈঠকের পর বৈঠক হলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবটি নিরাপত্তা পরিষদে পাস হতে পারেনি। কিন্তু তখনও পাকিস্তান তার অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিল। এমনই অস্থির সময়ে ভারতে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার পড়ে যায় চরম উৎকণ্ঠায়। একাত্তরের এই দিনে তারা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে লিখিত এক পত্রে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য অনুরোধ করে। এ চিঠিতে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দিয়ে বলা হয়- ‘উভয় দেশের এই ভয়াবহ বিপদে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ ভারতের সঙ্গে রয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক আশা রয়েছে, যৌথ প্রতিরোধে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের হীন পরিকল্পনা ও জঘন্য চক্রান্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য। সফলতা অবসম্ভাবী।’ অপরপক্ষে এদিন দুপুরে এক বেতার ভাষণে ইয়াহিয়া খান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বলেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনী শত্রুকে কেবল আমাদের ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করবে না, শত্রুর ভূখণ্ডে গিয়েও তাদের নির্মূল করবে।’ কথাগুলো ছিল তার শুধুই আস্ফালন। রণাঙ্গনে তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ক্রমেই পিছু হটছে। তেজদ্বীপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা দখলদার মুক্ত করছে দেশের বিভিন্ন এলাকা। পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটিগুলোতে অবিরাম গোলাবর্ষণ করছে। পালানোর পথ খুঁজছে পাকিস্তানি হানাদাররা।

এদিন যৌথবাহিনীর তিনটি ডিভিশন যশোর, পঞ্চগড় ও চুয়াডাঙ্গা দিয়ে ঢাকা অভিমুখে এগোতে থাকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলার দামাল মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণপণ লড়াই করতে থাকেন। দখলদার মুক্ত হয় বিভিন্ন এলাকা।
স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও মহান মুক্তিযুদ্ধের সে সব বীরত্বগাথা ইতিহাস বাংলাদেশীদের নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা যোগায় ।