Agaminews
Dr. Neem Hakim

ভবদহের জলভাসী মানুষের জীবন যেন বাঁশের সাঁকোতে বাঁধা


বার্তাকক্ষ প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ৩, ২০২০, ৫:২০ অপরাহ্ন /
ভবদহের জলভাসী মানুষের জীবন যেন বাঁশের সাঁকোতে বাঁধা

স্বীকৃতি বিশ্বাস।

যশোর সদরের কিছু অংশ,অভয়নগর, মনিরামপুরের অধিকাংশ, কেশবপুর, ডুমুরিয়া ও ফুলতলার অংশ বিশেষ নিয়ে দীর্ঘাস্থায়ী ভাবে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় আশির দশক থেকে অদ্যাবধি। জলাবদ্ধ এই এলাকার নাম ভবদহ এলাকা। বাংলাদেশের বন্যা প্রবন এলাকাগুলোতে দেখা যায় বন্যার পানি কিছু দিন পর বাড়িঘর উঠান,মাঠঘাট থেকে নেমে যায় কিন্তু ভবদহ এলাকার মানুষের বাড়িঘর,উঠান ও রাস্তায় পানি দীর্ঘদিন অাবদ্ধ অবস্থায় থেকে যায়। ফলে অত্র এলাকার মানুষের দুর্ভোগ এখন চরমে।
ভবদহ এলাকার মানুষের জলাবদ্ধতা নিরসন কল্পে ভবদহ এলাকার বিভিন্ন সংগঠন অতীতে ও এ বছরের অক্টোবর – নভেম্বর মাসে একাধিক কর্মসূচী- পাড়ায়, মহলায় ছোট দলীয় সভা, পথ সভা,বাজারে বাজারে সভা,সুধী জনের সাথে মতবিনিময়, পানির মধ্যে মানব বন্ধন,রাজপথে মানব বন্ধন, ডিসি অফিস ঘেরাও এবং প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারক লিপি প্রদানসহ আমডাঙা খালের ব্লক অপসরনসহ ছোটবড় আরও অনেক কর্মসূচী গ্রহন করেন। অামডাঙাখালের ব্লক অপসরণ করার ফলে পানি কিছুটা কমলেও স্থানীয় জনগনের অলীক স্বপ্ন বোরো ধানের আবাদ করা তা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে। ফলতঃ ভবদহ এলাকার মানুষ ৩ থেকে ৪ মাস স্থায়ীভাবে পানির মধ্যে বসবাস করছেন
অত্র এলাকার কয়েক লক্ষাধিক জনগন।

তাদের অবস্থাটা এমন যেন তারা বাংলাদেশে থাকলেও মনে হয় ভিন্ন কোন দ্বীপে বসবাস করছেন। সেখানে জন প্রতিনিধিরা থেকেও যেন নেই। জলাবদ্ধতার কারনে সমস্যায় আছে শিশু,কিশোর- কিশোরী ,যুবক-যুবতী বৃদ্ধবৃদ্ধা ও মহিলারা। কারন চারিদিকে পানি থাকায় শিশুরা খেলাধুলা করতে পারছে না।ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।আবার শিশুর মায়েরা যখন রান্নাবান্না বা জৈবিক কাজের জন্য যাচ্ছেন তখন শিশুদের কোমরে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে যাচ্ছেন।যা সত্যি অমানবিক। কিন্তু তার পরেও অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। তেমনি একটা দুর্ঘটনা ঘটে
ঘটে অভয়নগর উপজেলার রামসরা গ্রামে। উঠানে জমে থাকা পানিতে পড়ে মাবাবার একমাত্র সন্তান মৃত্যু বরণ করায়, সন্তান হারিয়ে পাগল প্রায়।

ভবদহের জলাবদ্ধ নিরসনে কার্যত কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে এ অঞ্চলের প্রতিটি বাড়ি ও তার আশপাশের এলাকায় জমে আছে পানি। এ অবস্থায় ঘরের বাইরে আসতে তাদের একমাত্র ভরসা বাঁশের সাঁকো।
শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, পানি আগের তুলনায় সামান্য কমলেও বাড়ির উঠান থেকে এখনো নামেনি। এ অবস্থায় বাঁশের ওপর দিয়ে এ ঘর থেকে ও ঘরে, এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি যাতায়াত করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
কথা হয় মণিরামপুর উপজেলার হাটগাছা গ্রামের মৃত সমীর বৈরাগীর স্ত্রী মাধুরী বৈরাগীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘১৫ দিন আগে আমার বাড়ির উঠোনে মাজা পর্যন্ত জল ছিল, হঠাৎ আমার স্বামী স্ট্রোক করলো। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য আমার কোনো নৌকা ছিল না। তাই প্রতিবেশির কাছ থেকে নৌকা ধার করে আনতে আনতে আমার স্বামী মারা গেল। এই কথা বলতে বলতে তিনি হাউ মাউ করে কেঁদে ফেললেন।
তাপস মণ্ডল নামে একজন বললেন, ‘গত এক মাসের মধ্যে স্ট্রোকে মৃতবরণ করেন উপজেলার হাটগাছা গ্রামের বিরাট মণ্ডলের মেয়ে শিউলী মণ্ডল (৩২), দশারথ মণ্ডলের ছেলে সোমনাথ মণ্ডল (৩৫), প্রভাত মণ্ডলের ছেলে রণজিত মণ্ডল (৪০) ও হাটগাছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য মহানন্দ মণ্ডল (৫০)। রোগীদের বাড়ি থেকে দ্রুত বের করতে না পারায় তারা চিকিৎসা না পেয়েই মারা গেছেন।তাছাড়া রাস্তায় জলাবদ্ধতা ও রাস্তা খানা খন্দ থাকায় গুরুতর অসুস্থ রোগীও সঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে অসংক্রামক ব্যধিতে লোক মারা যাচ্ছে।আর এ অসংক্রামক ব্যাধির মূল কারন দীর্ঘদিন ফসল না হওয়ায় খাওয়াপরার জন্য মানসিক দুঃশ্চিন্তা।
তিনি আরো বলেন, ‘ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য বাঁশের সাঁকো আর নৌকা আমাদের ভরসা। আমার বাবাও অসুস্থ, কিন্তু তাকে চিকিৎসা করাতে বাইরে নিয়ে যাব, তার কোনো উপায় নেই। আমার বাড়ি থেকে পাকা রাস্তায় উঠতে প্রায় আধা কিলোমিটার পথ জলাবদ্ধ। এ রাস্তায় তাকে ঘর থেকে বের করা দুরূহ।


মহিষদিয়া গ্রামের নিতাই মল্লিক বললেন, ‘সাঁকো ও নৌকা বানানোর টাকা আমার নেই। অনেক কষ্ট করে,কাট বাস এগুলো জোগাড়করে তৈরি করেছি।অভয়নগর উপজেলার ডুমুরতলা গ্রামের শিক্ষক শিবপদ বিশ্বাস বললেন, নওয়াপাড়া-মশিয়াহাটী সড়কের সরখোলা, ডুমুরতলা, বেদভিটাসহ অসংখ্য রাস্তায় এখনো জল। অধিকাংশ স্কুলের মাঠ থেকে এখনো জল নামেনি। বাড়ির চারপাশে জল জমে থাকায় পানিবাহিত রোগসহ ঠান্ডাজনিত রোগ দেখা দিচ্ছে। নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোর মতো যেকোনো মুহূর্তে আমাদের জীবন ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে পারে। আমাদের দুঃখ দেখার কেউ নেই। (টিআরএম) না হলে আমাদের দুঃখের শেষ হবে না।

হাটগাছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি অবসর প্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক অনাথ বন্ধু বিশ্বাস বলেলেন, ‘ভবদহের জন্য প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়, কিন্তু ভবদহ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সব লুটপাট হয়ে যায়।

গত কয়েকমাস ধরে মানুষ জলাবদ্ধ হযে থাকলেও সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা এই অঞ্চলের মানুষ পায়নি। বার বার যোগাযোগ করেও কোনো লাভ হচ্ছে না।মণিরামপুর উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা এসএম আবু আব্দুল্লাহ বায়েজিদ বললেন, এ বছর জলাবদ্ধ অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত পারিবারের তালিকা করা।হয়নি ফলে এখনো কোনো বরাদ্দও পাওয়া যায়নি।
কিন্তু অত্র এলাকার জলভাসী মানুষের দাবী তারা ত্রাণ চায় না, চায় ভবদহের এই করাল গ্রাস থেকে মুক্তি।আর মুক্তির জন্য তারা বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর কৃপা দৃষ্টি প্রার্থনা করেন।