Agaminews
Dr. Neem Hakim

বিজয়ের মাস- ডিসেম্বরের এই দিন


বার্তাকক্ষ প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ৩, ২০২০, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ন /
বিজয়ের মাস- ডিসেম্বরের এই দিন
 আধার যত গভীর হয়
সূর্যোদ্বয়ের পূর্বাভাস ততো সন্নিকটে আসে। তেমনিভাবে ডিসেম্বর মাসের এক একটি দিন শেষে বিজয়ের পথ একটু একটু করে অগ্রসর হচ্ছিল।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের ৩ তারিখ ছিল শুক্রবার। এদিন মুক্তিবাহিনীর চর্তুমুখী আক্রমনে পাক হানাদার বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে। ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকেই বাংলা মায়ের দামাল সন্তানেরা বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় বিজয়ের বেশে এগিয়ে যেতে থাকে। আর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এ সময় পূর্বের থেকে বেশী পরিমানেহত্যা,লুন্ঠন,ধর্ষণ,নির্যাতন,অগ্নিসংযোগ
,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অাক্রোমন ওধ্বংসযজ্ঞের মতো লীলা খেলায় মত্ত হয়ে গেল।যেন মনে হল শেষ মরণ কামড় দিতে উদ্যত।
১৯৭১ সালের এ দিন বিকেলে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী কালকাতার এক বিশাল জনসভায় ভাষণদানকালে পাকিস্তান ভারতের অমৃতসর, পাঠানকোর্ট, শ্রীনগর, অবনত্মীপুর, উত্তরালই সহ আগ্রার বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণ করে।ভারতের বিমানবাহিনীর স্থাপনা ও রাডার স্টেশনগুলোতে বিমান হামলা চালায়। হামলার খবর শুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতা সফরকালে ব্রিগেড প্যারেড ময়দানের সভা সংক্ষেপ করে সন্ধ্যায় হঠাৎ দিল্লী রওয়ানা হন। রাতে জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে তিনি বলেন, পাকিস্তান আজ ভারতের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক হামলা চালিয়েছে। ভারতকে এ যুদ্ধ মোকাবিলা করতে হবে। পাকিস্তানের আক্রমণ ঐক্যবদ্ধভাবেই প্রতিহত করতে হবে। পাকিস্তান বাহিনীর এই হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ঐ দিন রাত সাড়ে ১১টায় ভারতীয় বাহিনীও পাকিস্তানের উপর পাল্টা হামলা চালায়। এই হামলার একটা দূরভি সন্ধিমূলক উদ্দেশ্য,বর্হিবিশ্বের কাছে মুক্তিযুদ্ধকে অন্যখাতে ভিন খাতে প্রবাহিত করে পাক-ভারতের মধ্যেকার অভ্যান্তরীন যুদ্ধ বলে চালিয়ে দিয়ে জাতিসংঘের নিকট থেকে বিশেষ সুবিধা আদায় করা। পাকিস্তান চেয়েছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ নিকট থেকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা আদায়। এভাবে ঐ দিনেই ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয় ।

তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন জানায়, বাংলাদেশ সম্পূর্ণ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদে যেকোনো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তারা ভেটো দিবে।

আর এর পর থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এক নতুন মাত্রা পায়। পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়। ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মুক্তিবাহিনী সম্মিলিতভাবে সম্মুখযুদ্ধে এগিয়ে যায়। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সার্থক হামলায় নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও চট্টগ্রামের ফুয়েল পাম্প মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধারা একের পর এক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত করে পাকিস্তানি সেনাদের ফাঁদে পড়া চামচিকার মতো কোণঠাসা করে ফেলে।

কুমিল্লায় মেজর আইনউদ্দিনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা মিয়াবাজারেও পাকবাহিনীর উপর হামলা চালায়। ভারতীয় আর্টিলারি বাহিনীর সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধারা মিয়াবাজার দখল করে নেয়। আখাউড়ার আজমপুর স্টেশনে দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে দিনভর যুদ্ধ চালিয়ে যায়। সিলেটের ভানুগাছায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন। নোয়াখালীতে সুবেদার মেজর লুৎফর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল সোনাইমুড়ি মুক্ত করে। এরপর তারা চৌমুহনীতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় পাকবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়।

এদিকে জামায়াতের গোলাম আজম করাচীতে বলেন,জুমার নামাজের পর ভারতীয় হামলার প্রতিবাদে একটি মিছিল চট্টগ্রাম শহর প্রদক্ষিণ করে লালদীঘি ময়দানে জড়ো হবে। জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আল-মাদানীর সভাপতিত্বে এ সভায় বক্তব্য রাখেন কনভেনশন লীগ প্রধান ফজলুল কাদের চৌধুরী,পিডিপির মাহমুদুন্নবী চৌধুরী, ছাত্রনেতা আবু তাহের প্রমুখ।
এদিকে পাকিস্তানের ভারত আক্রমণের জের ধরে এ দিনে গঠন হয় বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড। ভারত ও বাংলাদেশ বাহিনী সম্মিলিতভাবে পূর্ব সীমান্তে অভিযান শুরু করে। ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশের পাক অবস্থানকে ঘিরে ফেলার প্রচেষ্টায় সীমান্তের ৭টি এলাকা দিয়ে প্রচণ্ড আক্রমণ পরিচালনা করে। পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের চার ডিভিশন সৈন্য,ভারতের সাত ডিভিশন সৈন্য ও মুক্তিযোদ্ধার মুখোমুখি হয়।
মেজর জাফর ইমামের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী মাইজদীতে পাকবাহিনীর ওপর তীব্র আক্রমণ চালায়। রংপুরের পলাশবাড়ীতে ১২ জন পাকসেনা আত্মসমর্পণ করে। সাতক্ষীরা থেকে পিছু হটে খুলনার দৌলতপুরের দিকে যায় পাকবাহিনী।
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর দুপুর ১২টার দিকে বরগুনা শত্রু মুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বরগুনার বিভিন্ন জায়গায় পাক হানাদার বাহিনী পৈশাচিক নারী নির্যাতন ও নির্বিচারে গণহত্যা চালায়।আর গণহত্যায় শহীদের গণকবর আজও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহন করে প্রতিটি বাংলাদেশীর হৃদয়ে।
– সংগৃহিত।