Agaminews
Dr. Neem Hakim

করোনার আবহে দুবলার চরের রাস উৎসব


বার্তাকক্ষ প্রকাশের সময় : নভেম্বর ২৮, ২০২০, ৬:৫৩ অপরাহ্ন /
করোনার আবহে দুবলার চরের রাস উৎসব

 স্বীকৃতি বিশ্বাস

রস থেকেই রাস শব্দের উৎপত্তি। রাস হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের সর্বোত্তম মধুর রস। আর লীলা মানে খেলা। অর্থাৎ রাসলীলার মানে শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরাধা ও সখী গনের লীলাখেলা। দুবলার চরের রাস উৎসবঃ দুবলার চরটি একেবারে সুন্দরবনের শেষ মাথায়, বঙ্গোপসাগরের কোলে অবস্থিত। কুঙ্গা ও মরা পশুর নদের মাঝখানে অবস্থিত দুবলার চরটি আসলে একটি দ্বীপ।এই দ্বীপটি মূলতঃ একটি অস্থায়ী জেলে গ্রাম। বছরের চারমাস সেখানে জেলেরা বসবাস করে।

রাস উৎসব অনুষ্ঠিত হয় মূলতঃ জেলেদের ফিরে আসার ঠিকপূর্ব মুহূর্তে অর্থাৎ বিদায়ের আগে উৎসবের আয়োজন! এই আয়োজন শুরু নিয়ে বহুজনের বহু মত পাওয়া যায়। মতের পার্থক্য রয়েছে এটি কবে শুরু হলো তা নিয়েও। অনেকে বলেন,” আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে এই উৎসবটি শুরু হয়েছিল।”আবার কেউ কেউ বলেন, ২০০ বছরেরও বহু আগে রাস উৎসবটি শুরু হয়েছিল।” অর্থাৎ এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে কীভাবে শুরু হয়েছিল- তা নিয়ে লোকমুখে নানা পৌরাণিক কাহিনী শুনতে পাওয়া যায়। বিভিন্ন গ্রন্থাদিতে যেসব বর্ণনা পাওয়া যায়, তা মূলতঃ লোককথার লৈখিক রূপ মাত্র। ১৯১৮ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে এরূপ একটি উপাখ্যান উল্লেখিত আছে। অনেকদিন আগের কথা, বঙ্গদেশে ধনপতি নামের সওদাগর ছিল। নামের সাথে তার কাজেও মিল ছিল।

তিনি প্রকৃত পক্ষেই একজন ধনপতি ছিলেন। তার নিবাস ছিল খুলনার পাইকগাছা উপজেলার রামনগরে। সেই ধনপতি একদিন সমবিহারে সিংহল যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখতে পান, সমুদ্রের ওপর ফুটে রয়েছে এক মোহনীয় পদ্মফুল। আর সেই পদ্মের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন অপরূপ এক দেবী। সওদাগর দেবীদর্শনের পর এ ঘটনা খুলে বলেন,”সিংহলের রাজা শালিবাহার আর তার মন্ত্রী গজাননের কাছে।” বর্ণনা শুনে রাজা সওদাগরকে বললেন, “এ তো দেবী কমলকামিনী। আমরা তার পূজা করি। কিন্তু তার দর্শন আমরা কোনদিন পাইনি।” রাজা দেবী দর্শনের জন্য সমুদ্রে নৌকা ভাসালেন।কিন্তু দেবী কমল কামিনীর দেখা পেলেন না। রাজা এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সওদাগরকে বন্দী করে রাখলেন। ধনপতি সওদাগর সমুদ্রযাত্রায় বের হওয়ার আগে স্ত্রী খুল্লনার গর্ভে একটি পুত্রসন্তান রেখে যান। কিছুদিন পর সন্তানের জন্ম হয়।

তার নাম রাখা হয় শ্রীমন্ত। বড় হয়ে শ্রীমন্ত তার মায়ের কাছে জানতে পারেন, তার বাবাকে সিংহল রাজা শালিবাহার অন্যায়ভাবে বন্দী করে রেখেছে।শ্রীমন্ত তার বাবাকে মুক্ত করার জন্য সিংহলের দিকে রওনা দিলেন। যাত্রাপথে শ্রীমন্তপ পিতার ন্যায় পদ্মের ওপর দেবী কমলকামিনীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। সিংহল পৌঁছে শ্রীমন্তও পিতার ন্যায় রাজাকে এ ঘটনা খুলে বললেন। রাজা শ্রীমন্তকেও মিথ্যবাদী অপবাদ দিয়ে বাবার মতো বন্দী করে রাখলেন। এমনকি তাদের দু’জনকেই মৃত্যুদণ্ড প্রদানের আদেশ দিলেন। এবার কার্যকর করার পালা।মৃত্যুদন্ডে দেওয়ার জন্য পিতা-পুত্রকে বলিকাঠে শোয়ানো হলো। জল্লাদ খড়্গ দিয়ে মাথা ফেলে দেবে এমন সময় অদৃশ্য দেবী কমলকামিনী দৃশ্যমান হলেন। তিনি বৃদ্ধার বেশে এসে রাজার কাছে পিতা ও পুত্রের জীবনভিক্ষা চাইলেন। সিংহল রাজা সহসা দেবীকে চিনতে পারলেন এবং নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। ফলে পিতা-পুত্রকে মুক্ত করে দিলেন। এরপর সিংহলের রাজা দেবী কমলকামিনীর পূজা শুরু করেন।শুধু তা-ই নয়, তিনি তার রূপসী কন্যাকে সওদাগরের ছেলের সাথে বিবাহ দিয়ে ধন-রত্ন ও মণি-মুক্তা বোঝাই করে বঙ্গদেশে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু সমুদ্র পথে ফিরে আসার সময় হঠাৎ সমুদ্রে গর্জন শুরু হলো। সওদাগরের তরী ডুবে গেল। এমন সময় দেবী কমলকামিনী পদ্মে ভেসে এসে তাদের উদ্ধার করে কুঙ্গা নদের মোহনায় পৌঁছে দিয়ে ফের অদৃশ্য হয়ে যান।

এই কুঙ্গার তীরই হচ্ছে দুবলার চর। আর সেদিন ছিল রাস পূর্ণিমা তিথি। এরপর থেকেই কুঙ্গা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন দুবলার চরে মা কমলকামিনীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মা কমলাকামিনী ছিলেন খুবই শুশ্রী চেহারার অধিকারী। আর তাই মা কমলাকামিনীর ন্যায় সুন্দরী মেয়েদের ‘কমলাসুন্দরী’ বলে ডাকা হয়। রাস মেলার সময় সকল জনগনকে সহজে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। সরকারের কাছে নির্দিষ্ট হারে খাজনা দিয়ে ট্রলারে করে দুবলার চরে যাওয়া যায়। ভোলা,খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে এ চরের দিকে যাত্রা করা যায়। রাসমেলা উপলক্ষে দুবলার চর উৎসবের লোকালয়ে পরিণত হলেও হাজার হাজার জেলের নিষ্ঠুর ও কষ্টের জীবনযাপনের জীবন্ত স্বাক্ষী গহীন বনের দুবলার চর! রাস উৎসব মূলতঃ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি বাৎসরিক উৎসব। যদিও উৎসবটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কিন্তু বর্তমানে এটা সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর কার্তিক মাসের শেষের দিকে অথবা অগ্রহায়ন মাসের প্রথম দিকের ভরা পূর্ণিমার সময় এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা পূর্ণিমার জোয়ারের নোনা পানিতে স্নান করে পবিত্রতা অর্জন করার জন্য সেখানে গমন করেন। তাদের বিশ্বাস, এই স্নান তাদের পাপ মোচন করে মনের সকল উত্তম কামনা পূর্ণ করবে। করোনার আবহে দুবলার চরের রাস উৎসবঃ চলতি বছর রাসপূজা হবে ২৮–৩০ নভেম্বর/২০২০ পর্যন্ত।

এর মধ্যে ২৮ নভেম্বর বাগেরহাটের মোংলা থেকে রাসপূজা উপলক্ষে যাত্রা শুরু করবেন আয়োজকেরা। ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে পূজা আর ৩০ নভেম্বর প্রথম প্রহরে স্নান অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ফিরতে শুরু করবেন পুণ্যার্থীরা। করোনা সংক্রমণ মহামারীর আকার ধারন করায় ১৯ মার্চ/২০২০ তারিখ থেকে সুন্দরবনে পর্যটক প্রবেশের অনুমতি দেওয়া বন্ধ করে দেয় বন বিভাগ কিন্তু করোনা সংক্রম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকায় আবার ১ নভেম্বর/২০২০ তারিখ থেকে পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন খুলে দেওয়া হয়। প্রতিবছর রাসমেলা উপলক্ষ্যে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয় দুবলার চরে। ভোলা, খুলনা,যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বহু বিদেশী পর্যাটক রাস মেলা দেখতে এবং পাপ মোচন করে পূর্ণ অর্জনের জন্য দুবলার চরে আসেন।উৎসবকে উপলক্ষ করে কিছু অসাধু শিকারী অনেক হরিণ শিকার করেন যা বন বিভাগের স্বল্প লোকবল দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না।তাই ২০১৯ সাল থেকেই রাসমেলায় সনাতন ধর্মাবলম্বীবাদে অন্য সম্প্রদায়ের লোকদের আসা-যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনা করছিল সরকার ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা। দ্বিতীয় পর্যায়ের করোনার সংক্রমন শুরু হওয়ায় বন বিভাগের পূর্বের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা খুবই সহজ হয়েছে।

কিন্তু বন বিভাগের এই নিয়ন্ত্রনকে রাসমেলা উদযাপন পরিষদ স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন না।তারা বলতে চাইছেন, এ উৎসব সার্ব্বজনিন উৎসব তাই কোন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া আদৌ কাম্য নয়।পুনঃ বিবেচনা করে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হোক।

রাস উৎসব পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে সকল বাঁধাবিঘ্ন, বিপদ আপদ, রোগব্যাধি থেকে মানব জাতিকে রক্ষা করা তাই এ বারের উৎসবের একমাত্র চাওয়া করোনার মতো মহামারী থেকে পৃথিবীর সমস্ত মানব সন্তান রক্ষা পাক এবং মানুষ যেন পূর্বের মতো আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাক। সকল জীবের কল্যানই হোক এবারের রাসমেলার ঐকান্তিক চাওয়া।