Agaminews
Dr. Neem Hakim

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অন্যতম একটি আকর্ষণ হলো সেন্টমার্টিন দ্বীপ।যা সমুদ্রের সৌন্দর্যকে করেছে আরো সমৃদ্ধ।


বার্তাকক্ষ প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১৯, ২০২০, ১:৪২ অপরাহ্ন /
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অন্যতম একটি আকর্ষণ হলো সেন্টমার্টিন দ্বীপ।যা সমুদ্রের সৌন্দর্যকে করেছে আরো সমৃদ্ধ।

ইমন ইসলাম, জাবি প্রতিনিধি

বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের জেলা কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় অবস্থিত সেন্টমার্টিন দ্বীপ। সেন্টমার্টিন দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ হলো এখানে বংশবিস্তার করা শত শত নারিকেল গাছ। প্রচুর নারিকেল পাওয়া যায় বলে স্থানীয়ভাবে সেন্টমার্টিনকে বলা হয় নারিকেল জিঞ্জিরা।

সেন্টমার্টিন হলো বাংলাদেশের একমাত্র সামুদ্রিক দ্বীপ।সেন্টমার্টিন দ্বীপের অবস্থান সম্পর্কে বিভিন্নজন বিভিন্ন তথ্য দিয়ে থাকেন। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা থেকে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বুকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের অবস্থান।মাএ ৩৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে সেন্টমার্টিন দ্বীপের অস্তিত্ব। সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রচুর পরিমাণে প্রবাল পাথর দেখা যায়,যে কারণে এই দ্বীপ প্রবাল দ্বীপ নামেও পরিচিত।
সেন্টমার্টিন দ্বীপের ইতিহাস সম্পর্কে সুস্পষ্ট প্রমাণ না থাকলেও ধারণা করা হয় আরব বণিকদের দল বাণিজ্য করার পথে এই দ্বীপটি সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেছিল এবং এর নাম নির্ধারণ করেছিল জিঞ্জিরা।
পরবর্তীতে স্থানীয়রা জিঞ্জিরা নামেই সেন্টমার্টিনকে অবহিত করতে থাকে।
জানা যায় ১৮৯০ সালের দিকে বেশ কিছু বাঙালি ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোকজন মৎস্য শিকারের উদ্দেশ্য সেন্টমার্টিন দ্বীপে স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করে।
পরবর্তীতে সেন্টমার্টিন দ্বীপটিতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটলে বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে অসংখ্য মানুষ সেখানে ভীর জমাতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সেন্টমার্টিন দ্বীপ বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত হয়।
সেন্টমার্টিন দ্বীপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপে বসবাসরত জনসংখ্যার দেখাশোনার জন্য সরকার সেন্টমার্টিন দ্বীপকে দেশের একমাত্র ছোট্ট ইউনিয়ন হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। সেন্টমার্টিন দ্বীপের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৭ হাজার । এখানকার ৯০% শতাংশ মানুষ মৎস্যজীবী। গভীর সমুদ্র থেকে মৎস্য শিকার করে তা কক্সবাজারসহ আশেপাশের এলাকায় বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। আবার বাকি লোকজন নারিকেল সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে।
পরবর্তীতে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে পর্যটন শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হলে ,দেশের অসংখ্য মানুষ পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের সংগঠন সহ পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে বিভিন্ন হোটেল-মোটেলের ব্যবসা শুরু করে। সেন্টমার্টিন দ্বীপের সাথে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সরাসরি টেলিফোন সংযোগ না থাকলেও মোবাইল সংযোগের ব্যবস্থা করা হয়েছে।পর্যটক চাইলে মোবাইল ফোনে ডাটা কানেকশনের মাধ্যমে বিশ্বের যে কোন প্রান্তের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবে।
বর্তমান বাংলাদেশ সহ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান হলো সেন্টমার্টিন দ্বীপ।দেশের পর্যটন শিল্প থেকে অর্জিত আয়ের সিংহভাগ আসে এই খাত থেকে।
সেন্টমার্টিন দ্বীপে জীবন ধারণের প্রায় সবকিছুই পাওয়া যায়।প্রচুর সামুদ্রিক মাছ, মাছের শুঁটকি, নারিকেল, বার্মিজ চা,বার্মিজ আচার সহ আরো অনেক কিছু। এখানকার খাবারের হোটেল গুলোতে সবসময় পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। সেন্টমার্টিন দ্বীপের হোটেল গুলোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো মাছের তৈরি বারবিকিউ। সত্যি অসাধারণ খেতে সেই বারবিকিউ। সেন্টমার্টিন দ্বীপে এসেছে অথছ সদ্য ধরা সামুদ্রিক মাছের বারবিকিউ খায়নি এমন সংখ্যা নগণ্য।
এখানকার হোটেল গুলো রাত্রি যাপনের জন্য উপযুক্ত হওয়ায় পর্যটকরা সেন্টমার্টিন দ্বীপের রাত্রির সৌন্দর্য উপভোগ করতে থেকে যান।
প্রকৃতি নিজের মতো করে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে রাঙিয়ে তুলেছে তার বাহারি রঙের সংমিশ্রণে। সমুদ্রের উঁচু নিচু জলতরঙ্গের বুকে সবুজের সমারোহ গায়ে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেন্টমার্টিন দ্বীপটি।নীল জলরাশি মন্ডিত একখন্ড সবুজ ভূখণ্ড মূহুর্তেই মনে করিয়ে দেয় বাংলাদেশের অপার সৌন্দর্যের কথা।
সৈকতের শামুক -ঝিনুক ,স্বচ্ছ পানির নিচে রকমারি শৈবাল আর সাগর তীরের ঝাউগাছ মিলে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে বানিয়েছে অপরূপ এক সৌন্দর্যপুরীতে।
সেন্টমার্টিন দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ হলো এর প্রকৃতি।সাদা বালির মধ্যে থাকা প্রবাল পাথরের ধারা এর সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে তোলে। সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে  সূর্যদয় এবং সূর্যাস্ত উভয়ই উপভোগ করা যায়।
সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল ,১৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক ১৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির গুপ্তজীবী উদ্ভিদ, ২৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, চার প্রজাতির উভচর ও ১২০ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে পেজালা নামে পরিচিত Sea weeds বা অ্যালগি (Algae) এক ধরনের সামুদ্রিক শৈবাল সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এগুলো বিভিন্ন প্রজাতির হয়ে থাকে তবে লাল অ্যালগি (Red Algae) বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয়। এছাড়াও রয়েছে ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী।অমেরুদন্ডী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে স্পঞ্জ, শিল কাঁকড়া, সন্যাসী শিল, কাঁকড়া ইত্যাদি। মাছের মধ্যে রয়েছে পরী মাছ, প্রজাপতি মাছ, বোল করাল,রাঙ্গা কই, সুঁই মাছ, লাল মাছ,উড়ুক্কু মাছ ইত্যাদি। সামুদ্রিক কচ্ছপ, সবুজ সাগর কাছিম এবং জলপাইরঙা সাগর কাছিম প্রজাতির ডিম পাড়ার স্থান হিসেবে সেন্টমার্টিন দ্বীপ আদর্শ জায়গা।
অথচ বর্তমান এই সুন্দর দ্বীপটি বিভিন্ন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।মাদক চোরাচালানের আখ্রায় পরিনত হয়েছে সৌন্দর্যের রানী খ্যাত সেন্টমার্টিন দ্বীপটি।
যত্রতত্র ইটের দালান কোঠা সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য নষ্ট করছে। অবৈধভাবে প্রবাল পাথর উত্তোলন প্রবাল দ্বীপের সৌন্দর্য নষ্ট করছে।
তাই দেশের পর্যটন শিল্পের এই প্রধান খাতটি রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের বিকল্প নেই। তাই সেন্টমার্টিন দ্বীপ রক্ষায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা খুবই সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।