Agaminews
Dr. Neem Hakim

এবারের শীতে মাতবে না জাবির পিঠে-পুলি ও ভর্তা উৎসব


বার্তাকক্ষ প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১৬, ২০২০, ১:১৯ অপরাহ্ন /
এবারের শীতে মাতবে না জাবির পিঠে-পুলি ও ভর্তা উৎসব
ইমন ইসলাম,জাবি প্রতিনিধি

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের  অনন্য লীলাভুমি খ্যাত আমাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় সাংস্কৃতিক রাজধানী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শুধু মাত্র একটি উচ্চ শিক্ষার বিদ্যাপিঠ নয় ,এটি একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত গ্রাম হিসেবেও সমাধিক পরিচিত। এখানকার অধিবাসীদের অকৃত্রিম ভালোবাসায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একটি আধুনিক গ্রামে পরিনত হয়েছে।তাই জাবিতে শীতের আগমন কোন ভাবেই গ্রামের শীতের চেয়ে ভিন্ন নয়।এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সহ সকলেই শহরে বসে গ্রামের শীতের আনন্দ উপভোগ করতে পারে।

সবুজের নৈস্যর্গিক সমারোহ ঘেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শীত আসে চিরচেনা রূপের বাইরে আরও কিছু মুগ্ধতা নিয়ে। আসে অনবদ্য কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে। এবারো সারাদেশের মতোই জাবিতেও শীত এসেছে আগেভাগেই। তবে তাতে ক্যাম্পাসে শীতের যে বর্ণিল রূপ তাতে একটুও ছেদ পড়েনি।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ২৬ টি লেক এবং অসংখ্য গাছপালা ও জঙ্গলে পরিপূর্ণ।এযেন প্রকৃতির আরেকটি অংশ।জাবিতে রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির পাখি,সাপ, রংবেরঙের কাঠবিড়ালী, কুকুর,বিড়াল মিলিয়ে এ যেন অন্যরকম এক দুনিয়া।এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন মেধাবী ঠিক আবার প্রকৃতিপ্রেমী ও বটে। এখানকার শিক্ষার্থীদের ঘুম ভাঙ্গে পাখির কলকাকলিতে।
শীতকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য শতগুণ বৃদ্ধি পায়। কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশে ঠকঠক কাঁপতে কাঁপতে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া ,যেন অন্যরকম একটা পরিবেশের সৃষ্টি করে। শীতের সকালে ক্যম্পাসের চায়ের দোকান গুলো সবচেয়ে বেশি জমে ওঠে। ভর্তা উৎসব জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম আকর্ষণ।বিভিন্ন প্রকারের ভর্তার মৌ মৌ গন্ধে ভরে ওঠে পুরো ক্যম্পাস।এ যেন ভর্তার রাজ্য। বাংলাদেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে শিক্ষার্থীদের আহারের জন্য বটতলা /খাবারের হোটেল রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা হলো শিক্ষার্থীদের মিলন মেলা। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শিক্ষাথী ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকে এই বটতলা। সেই সঙ্গে চলে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা। এটিই বটতলার প্রাণ। শুধু শিক্ষার্থীরাই না, বাহিরের দর্শনার্থীরা অন্তত একবারের জন্য হলেও এখান থেকে খেয়ে যান।
না হলে এ ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসাটা যেন তাদের অতৃপ্তই থেকে যায়। জাহাঙ্গীরনগরে ঘুরতে এসেছেন অথচ বটতলায় খাননি এমন লোক হয়ত খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। জাবির বটতলাতে ছোট-বড় মিলিয়ে ৫৫ টি দোকান রয়েছে।এসব দোকানে শিক্ষার্থীরা স্বল্পমূল্যে আহার করে থাকে। বিশেষ করে শীতের সময়টাতে খাবারের হোটেল হিসেবে পরিচিত বটতলা বেশি জমে ওঠে। শীতের ঠিক এই সময়ে বাহারি রকমের প্রায় ১২০ পদের ভর্তার আয়োজন করা হয় প্রতিদিন। একেকটি ভর্তা ৫ টাকা মূল্যে বিক্রি করা হয়।বাদাম ভর্তা, সরিষা ভর্তা, পেঁপে ভর্তা, ডাল ভর্তা, শিম ভর্তা, ধনেপাতা ভর্তা, কালিজিরা ভর্তা, বেগুন ভর্তা, ভেণ্ডি ভর্তা, টমেটো ভর্তা, আলু ভর্তা, লাউশাক ভর্তা, কলা ভর্তা, কচু ভর্তা, রসুন ভর্তা, ডিম ভর্তা, মরিচ ভর্তা।
এছাড়াও ইলিশ মাছের ভর্তা, শুঁটকি মাছের ভর্তা, চিংড়ি মাছের ভর্তা, টাকি মাছের ভর্তা, রুই মাছের ভর্তা, চিকেন ভর্তা,চ্যাপা শুঁটকি, লইট্টা শুঁটকি, মলা শুঁটকি, কাচকি শুঁটকি, চিংড়ি শুঁটকি, টাকি শুঁটকি, বাইন মাছ শুঁটকি, রসুন-শুঁটকি, লোনা ইলিশ, বাটা মাছ, টাকি মাছ, চিতল মাছ, ইলিশ মাছ, রুই মাছ, বোয়াল মাছ, বাইলা মাছ, বেলে মাছ, চিকেন, দেশি চিকেন, কালোজিরা, মাছ ও মুরগি ভর্তা ১০ টাকা। বাকী সব ভর্তাই ৫ টাকা। ভাত প্রতি প্লেট মাত্র ছয় টাকা।রয়েছে আরো বাহারি রকমের ভর্তা।এই হরেক রকমের ভর্তার রয়েছে আলাদা স্বাধ।বেলা বাড়ার সাথে সাথে শিক্ষার্থীরা খাবারের দোকান গুলোতে ভিড় জমাতে শুরু করে। শুধু শিক্ষার্থী নয়, যে স্বাধের গন্ধ নিতে প্রতি বছর ঠিক এই সময়টাতেই দেশের দূর-দূরান্ত থেকে শতশত পর্যটক আসছেন।
কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে হাড়ি থেকে সদ্য নামানো গরম ভাতের সাথে ভর্তা না খেলে এখানকার শিক্ষার্থীদের যেন ভাত হযম হতেই চায় না। শীতের সকালে তাই বটতলার দোকানিদের সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়।
পিঠাপুলির উৎসব জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতের আনন্দকে শতগুণে বাড়িয়ে তোলে। প্রতিবছর শীতকালের এই সময়টাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পিঠা-পুলির উৎসব জমে ওঠে।দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে জাবির পিঠার দোকান গুলোতে শিক্ষার্থীরা ভিড় জমাতে শুরু করে। শীতের এই সময়টাতে পিঠা তৈরীতে ব্যস্ত দেখা যায় জাবির পিঠা দোকানিদের।বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা, পরিবহন চত্বর, বঙ্গবন্ধু হল চত্বর, মীর মশাররফ হোসেন হল, জাহানারা ইমাম ও প্রীতিলতা হলের মাঝখানের স্বপ্ন চত্বরসহ পিঠার জন্য বিশেষ ভাবে গড়ে ওঠা মেডিকেল সংগলগ্ন পিঠা চত্বরে শীতের পিঠা তৈরি ও খাওয়ার ভিড় এতটাই যে, পিঠা পেতে গেলে রিতিমতো হিমসিম খেতে হয় শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা পর্যটকদের।শুধু ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরাই নয়, এই পিঠার টানে ছুটে আসেন সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পিঠা প্রেমীরা।জাবির পিঠাপুলিতে যেন অন্য রকমের স্বাদ খুঁজে পাওয়া যায়।
অথচ করোনার কারণে এবছরের মার্চ মাস থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বন্ধ রয়েছে , সেই সাথে বন্ধ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার সকল দোকানপাট। প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপের রানী হয়ে এসেছে শীত ।তবে সেই শীতকে বরন করার কেউ নেই। দীর্ঘদিন যাবৎ বন্ধ রয়েছে জাবির বটতলা। প্রতিবছর ঠিক এই সময়টাতে ভর্তা উৎসবে মেতে উঠতো জাবির বটতলা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবছর খোলার সম্ভাবনা না থাকায় অনিশ্চয়তার মুখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতকালীন ভর্তা উৎসব। তবুও আশায় বাঁচে নিরাশা। প্রতিটি শিক্ষার্থী এখনো অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে। আবার খুলবে ক্যাম্পাস, আবার খুলবে বটতলার দোকান,জমে উঠবে আড্ডা চায়ের চুমুকে। আবারও ভর্তার মৌ মৌ গন্ধে ভরে উঠবে ক্যাম্পাসের চারিপাশ।