Agaminews
Dr. Neem Hakim

বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের বর্তমান দূরাবস্থা এবং এর হাত থেকে মুক্তির উপায়


আবদুল্লাহ আল হাদী প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১৫, ২০২০, ১:২৪ অপরাহ্ন /
বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের বর্তমান দূরাবস্থা এবং এর হাত থেকে মুক্তির উপায়

ইমন ইসলাম,জাবি প্রতিনিধি  :   

কৃষি এবং কৃষক পরষ্পর একে অপরের পরিপূরক। কৃষক বিহীন কৃষিকাজ যেমন সম্ভব নয় তেমনিভাবে কৃষি ছাড়া কৃষক অর্থহীন। আদিকাল থেকেই অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে

সাধারণ অর্থে ফসল, পশুপাখি,মৎস চাষে মাটির জৈবিক ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনাকে কৃষি বল।তবে বৈজ্ঞানিক অর্থে কৃষির সঙ্গা দেওয়া বেশ জটিল। আধুনিক প্রযুক্তি বিজ্ঞানের কল্যাণে কৃষি হয়েছে আরো উন্নত ও আধুনিক।

বাংলাদেশের কৃষির বৈশিষ্ট্য সমূহ:
———————————————-
১) প্রাচীন চাষ পদ্ধতি
২) কৃষকদের নিম্ন উৎপাদন ব্যবস্থা
৩) অনাবাদি জমি
৪) জীবন ধারণের নিমিত্তে উৎপাদন
৫) ভূমিহীন কৃষক
৬) মাথাপিছু আয় কম
৭)আবাদ যোগ্য জমির সংকুলান
৮)একই ফসল বার বার চাষাবাদ

বাংলাদেশের মোট আবাদি জমির পরিমাণ ২ কোটি ২৫ লক্ষ্য একর।যার মধ্যে ২৫ লক্ষ্য হেক্টর জমি অনাবাদি থেকে যায় বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে।এই বিশাল জনসংখ্যার জন্য এই সামান্য পরিমাণ জমি সমীচিন নয়। বাংলাদেশের ৫৭% শতাংশ কৃষকের নিজস্ব কোন জমি নেই। অর্থাৎ অন্যের জমি চাষ করে ফসল উৎপাদন করে থাকে, এদেরকে বলা হয় ভূমিহীন কৃষক।

বাংলাদেশের কৃষি খাতের কয়েকটি উপখাত রয়েছে,
১) কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন
২) গবাদিপশু পালন
৩) মৎস্য চাষ

দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিপ্রধান একটি দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮০%শতাংশ লোক কৃষির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কৃষি খাত হলো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। নদী মাতৃক এই দেশের পলল ভূমি কৃষি কাজের জন্য উপযুক্ত হওয়ায় যুগে যুগে অনেক ভিনদেশিদের আগমন ঘটেছে এই দেশে।
বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের সিংহভাগ আসে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য থেকে। বাংলাদেশের কৃষি খাতের অর্থনৈতিক ফসল গুলো হলো,ধান,পাট,আখ,চা।
ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু করে, পাকিস্তান আমল,সর্বপরি স্বাধীনতা যুদ্ধের আগ পর্যন্ত বাংলার অর্থনীতিকে এই কৃষি খাতই চাঙ্গা রেখেছিল। প্রতিটি দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে বা উন্নত করতে কৃষি খাতের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অথচ আজ বাংলাদেশের অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে যুগে যুগে যে কৃষি খাত ও কৃষক নানা জুলুম অন্যায়- অত্যাচার সহ্য করেছে ,আজ সেই কৃষি খাত ও কৃষককুল দূর্দশাগ্রস্ত। রোদে-পুরে,বৃষ্টিতে ভিজে যে কৃষক চাষ না করলে ফসল হতো না ,ফসল থেকে খাদ্য তৈরি হতো না অথচ আজ সেই কৃষি তার নাব্যতা হারাচ্ছে , কৃষক অবহেলিত ও নিষ্পেসিত হচ্ছে।এর থেকে যেন মুক্তি মিলছেই না। অর্থনৈতিক দূরাবস্থার হাত থেকে মুক্তির অন্যতম একটি হাতিয়ার হলো কৃষি।

বৈদেশিক মুদ্রার সিংহ ভাগ অর্জিত হয় এই কৃষি খাত থেকে। প্রতিবছর কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি করে সরকার প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। অথচ আজ এই কৃষি খাত অবহেলিত। অনুন্নত কৃষি ব্যবস্থা, কৃষকের উন্নত প্রযুক্তি জ্ঞান না থাকা, অনুন্নত চাষ প্রদ্ধতি ,অনুন্নত সেচ ব্যবস্থা, অনুন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা , উন্নত চাষ ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা না থাকা, আবহাওয়া ও জলবায়ু গত সমস্যা, কৃষি কাজের সামাজিক মর্যাদা ও শিক্ষা না থাকা, কৃষি উন্নয়নে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ,সর্বপরি কৃষি কাজের প্রতি অনিহা ইত্যাদি সমস্যা গুলোর কারনেই দিনে দিনে অর্থনীতির এই খাতটি ভেঙে পড়েছে।যা মোটেই এদেশের মানুষের জন্য, অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়।

গবাদিপশু পালন হলো কৃষি খাতের অন্যতম একটি উপখাত। গবাদিপশু থেকে মূল্যবান দুগ্ধজাত খাবার ও চামড়া পাওয়া যায়। গবাদিপশুর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়।২০২০-২০২১ অর্থ বছরে চামড়া খাত থেকে এসেছে প্রায় ৭৩ কোটি ৯৩ লাখ ৯ হাজার মার্কিন ডলার।
মৎস্য চাষ কৃষি খাতের অন্যতম একটি উপখাত।প্রতি বছর মৎস্য খাত থেকে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়।অথচ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই যুগে কৃষির অনুন্নত ব্যবস্থার কারনে গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটি ডুবতে বসেছে।
বর্তমান এর প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ গতবছরের তুলনায় এবছর অনেক হ্রাস পেয়েছে। এবছরের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান আরো কমেছে। সদ্যবিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ছিল ১৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় দশমিক ৩০ শতাংশ কম।বিদায়ী অর্থবছরের মোট জিডিপির পরিমাণ ছিল ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে কৃষি থেকে এসেছে তিন লাখ ৪৭ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। যা ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ছিল তিন লাখ ২২ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা।এর থেকেই বোঝা যায় বাংলাদেশের কৃষি খাতের অবস্থা কতটা ভঙ্গুরের পথে।ভড়ন পোষনের জন্য ফসল উৎপাদন হচ্ছে কৃষি খাতের উন্নয়নের পথে অন্যতম একটি বাঁধা। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৭০ ভাগ লোক নিরক্ষর হওয়ায় জীবীকার তাগিদে তারা কৃষি কাজ করে থাকে।অথচ উন্নত দেশ গুলোতে কৃষি কাজকে বানিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদন করা হয় এবং তারা কৃষিকাজকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে।

কৃষিকে বলা হয়ে থাকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি আর কৃষককে বলা হয় অর্থনীতির ধারক।কৃষক ছাড়া কৃষি কাজ নিরর্থক। দেশের কর্মসংস্থানের ৭৫ শতাংশ সৃষ্টি হয় এই কৃষি খাত থেকে। অথচ আজ সেই কৃষকের মুখে অন্ন জোটে না। না,শস্যে উৎপাদনের জন্য অর্থ পায় না। চাষের জমি পায় না।শস্যের সঠিক মূল্য পায় না। সামাজিক অধিকার ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়। অতীতের ঘটনা গুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা জানতে পারি, রংপুরের কৃষক বিদ্রোহের কথা।যে কৃষক চাষ না করলে খাদ্য উৎপাদিত হত না,বাংলার অর্থনীতি শক্তি পেত না, মানুষ আহারের খাদ্য পেত না,আজ সেই কৃষক সবচেয়ে অবহেলিত, নিষ্পেষিত, বঞ্চিত।
প্রতি বছর বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, নদী ভাঙ্গন ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে লক্ষ্য লক্ষ্য কৃষির আবাদি জমি, উৎপাদিত ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবার কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ব্যাবসায়ীদের দূর্ণীতি ও সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে কৃষক তার তার উৎপাদিত ফসলের প্রকৃত পারিশ্রমিক ও মূল্য পাচ্ছে না।যার ফলে কৃষক কৃষি কাজের উৎসাহ হারাচ্ছে।

এ জন্যই কবি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন,”বাংলার কৃষকের পাছায় জোটে না ত্যানা।”

বিভিন্ন কৃষি বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে বিভিন্ন কৃষিবিদ ও বিশ্ব খাদ্য সংস্থার দাবি , দেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে কৃষি খাতের বিকল্প নেই। তাই প্রতিটি দেশের সরকারের উচিত হবে একটি দীর্ঘমেয়াদী কৃষি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া এবং উন্নত চাষ পদ্ধতির প্রবর্তন করা,প্রয়োজনে কৃষককুলকে উন্নত প্রযুক্তি জ্ঞান বিতরণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। উন্নত কৃষি সম্প্রর্কে কৃষকদের অবহিত করতে প্রয়োজনে প্রতিটি গ্রামে কৃষি সমিতি গড়ে তোলা। কৃষকদের বীনা সুদে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করা।নাম মাত্র মূল্যে উন্নত জাতের কৃষি বীজ বিতরন করা।প্রয়োজনে পোস্টার বিলি ও টেলিভিশনে বিভিন্ন কৃষি বিষয়ক সেমিনার পোগ্রাম ও অনুষ্ঠান প্রচার করা। কৃষি পণ্যে পরিবহনের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা । প্রশাসনের উচিত কৃষি পণ্যে বাজারজাত করনের ত্রুটিপূর্ণ সিন্ডিকেট কঠোর হাতে দমন করা যাতে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত শস্যের সঠিক মূল্য পায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির এই চালিকা শক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে আধুনিক কৃষি জ্ঞান, কৃষি প্রযুক্তির বিকল্প নেই। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য বয়ে আনবে। বাংলাদেশের কৃষি অনুন্নত হবার অন্যতম একটি কারণ হলো প্রাচীন চাষ পদ্ধতি। বাংলাদেশ ঋতু বৈচিত্র্যের দেশ‌ হওয়ায় জলবায়ু ও আবহাওয়া ঘনঘন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।এর ফলে একদিকে যেমন প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হয় ঠিক তেমনি আকস্মিক বন্যা, নদী ভাঙ্গন, জলোচ্ছ্বাসের কবলে পড়ে প্রতিবছর লক্ষ্য লক্ষ্য হেক্টর ফসলি জমি র শস্য নষ্ট হচ্ছে। আবার অন্যদিকে প্রশাসনিক জটিলতা কৃষিতে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। কিছু অসাধু ,দূর্ণীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কারনে কৃষি উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে থাকে। প্রতিবছর বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলের লক্ষ্য হেক্টর আবাদি জমিতে বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়।দূর্বল গঠন কাঠামো, অনুন্নত ব্যবস্থায় নির্মিত এসব বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কৃষি তে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে।যার ফলে কৃষককুল কৃষি ও চাষাবাদের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে।

প্রশাসনিক বিভাগ গুলোতে অসাধু,দূর্ণীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কঠোর হাতে দমন না করলে কৃষির উন্নয়ন সম্ভব হবে না।প্রয়োজনে বিদেশি কৃষিবিদ, গবেষকদের সাথে একটি মাস্টারপ্ল্যান গঠন করা। বাংলাদেশের কৃষিবিদদের উন্নত কৃষি প্রধান দেশ গুলোতে তাদের চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে ঝটিকা সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা।
কৃষি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা।প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত কৃষি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে গবেষণা করার জন সকল ধরনের উন্নত যন্ত্রপাতি ও আধুনিক ফর্মুলা ও প্রযুক্তির সরবরাহ করা।প্রয়োজনে বিদেশে যাতে শিক্ষার্থীরা কৃষি নিয়ে উচ্চ শিক্ষা নিতে পারে তার জন্য স্কলারশীপের ব্যবস্থা করা। জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতের জন্য আলাদা বাজেট নির্ধারণ। কৃষিকে জাতীয় করন করা।

তাই নিজের বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাদ্যের প্রয়োজন ঠিক তেমনি ভাবে একটি দেশের অর্থনীতি বাঁচিয়ে রাখতে কৃষি খাতের বিকল্প নেই ।