Agaminews
Dr. Neem Hakim

আজারবাইজান-আর্মেনিয়ার শান্তি চুক্তিতে তুরস্কের কী লাভ হলো?


বার্তাকক্ষ প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১৪, ২০২০, ১২:৩২ অপরাহ্ন /
আজারবাইজান-আর্মেনিয়ার শান্তি চুক্তিতে তুরস্কের কী লাভ হলো?

সরোয়ার আলম, চিফ রিপোর্টার এবং আঞ্চলিক প্রধান, আনাদলু নিউজ, তুরস্ক

নাগরনো-কারাবাখ যুদ্ধে অবশেষে পরাজয় মেনে নিলো আর্মেনিয়া! এ পরাজয় আসলে আজারবাইজানের বিরুদ্ধে আর্মেনিয়ার পরাজয় নয়। এটা তুরস্কের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের, এদোগানের বিরুদ্ধে ম্যাক্রোঁর পরাজয়। অন্যভাবে বলতে গেলে এটা মধ্য এশিয়া এবং ককেশাস অঞ্চলে তুরস্কের বিশাল এক কৌশলগত বিজয় তা বিশ্বের দরবারে তুরস্ককে আরেক উচ্চতায় নিয়ে গেল।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যস্থতায় আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকল পাশিনিয়ানের সঙ্গে এ চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

আজারবাইজানের সেনাবাহিনী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর শুশা দখলদার মুক্ত করার পরে খুব দ্রুত অন্য এলাকাগুলো থেকে আর্মেনিয়ার দখলদারি সেনাবাহিনীকে তাড়িয়ে দিয়ে যখন দুর্বার গতিতে সামনে এগোচ্ছিল ঠিক তখনই খবর আসলো এই শান্তি চুক্তির।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই শান্তি চুক্তিতে কার কি লাভ হলো। আমি আগেই বলেছি যে এই চুক্তিটি এমন এক সময় আসলো যখন আজারবাইজানের পূর্ণ বিজয় প্রায় শতভাগ নিশ্চিত। কিন্তু কেন এমন সময় আজারবাইজান চুক্তিটি মেনে নিলো? উত্তরঃ রাশিয়ার চাপে।

এ যুদ্ধে লাভবান কে কে? উত্তরঃ রাশিয়া, আজারবাইজান এবং তুরস্ক।

রাশিয়া ওই অঞ্চলে প্রধান শক্তি। রাশিয়া যতদিন চুপচাপ ছিল মানে আজারবাইজানকে যুদ্ধ করার অনুমতি দিয়েছিল আজারবাইজান ততদিন যুদ্ধ করেছে।

রাশিয়া কিভাবে লাভবান?
রাশিয়া তার মোক্ষম সময়টির জন্য অপেক্ষা করেছিল।

নাগর্নো-কারাবাখ অঞ্চলটি পুরো মুক্ত না করে বরং ঝুলিয়া রাখলে তাতে রাশিয়ারই লাভ। দুইও দেশের উপর খবরদারি করা সম্ভব। বিশ্বের বড় বড় মোড়লরা এজন্য আঞ্চলিক সমস্যাগুলো জিয়িয়ে রাখেন।

রাশিয়ার আরেকটি লাভ হল, এই শান্তি চুক্তির মাধ্যমে নাগর্নো-কারাবাখ অঞ্চলে রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটি করার বাবস্থা পাকা পোক্ত হল। কারণ চুক্তি অনুযায়ী আর্মেনিয়ার দখলকৃত নাগরনো-কারাবাখের সাতটি অঞ্চলের পাঁচটি আজারবাইজানের কাছে হস্তান্তর করে আর্মেনীয়রা ওই অঞ্চল ছেড়ে যাবে। বাকি দুটি অঞ্চলে রাশিয়ার শান্তিরক্ষী বাহিনী আগামী পাঁচ বছর টহল দিবে। টহলে থাকবে রাশিয়ার ১৯৬০ জন সৈন্য ৯০টি সাঁজোয়া যান এবং ৩৮০টি গাড়ি।

আজারবাইজান কতটুকু লাভবান?

আজারবাইজান যেহেতু পুরো অঞ্চলটি মুক্ত করার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। তাই এ মুহূর্তে যুদ্ধ বিরতির চুক্তি কিছুটা লোকসানের মত মনে হলেও আসলে এই চুক্তির প্রকৃত লাভবান তেল সমৃদ্ধ এই দেশটি। কারণ, এক. গত ২৮ বছর ধরে যে কাজটি করতে পারেনি সেটি দুই মাসের মত সময়ে করে দেখিয়েছে। দুই. আর্মেনিয়া আর কখনও আজারবাইজানের সামনে দাঁড়ানোর সাহস করবে না। তিন. যুদ্ধ না করেই ২-৩ টি অঞ্চল ফেরত পাবে। যুদ্ধ মানেই প্রাণ হানি, সেটা আপনি যতই শক্তিশালী বা দুর্বল হন না কেন। সুতরাং বিনা যুদ্ধে কিছু অঞ্চল ফেরত পাওয়া কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। চার. সারা বিশ্বে আর্মেনীয় লবির মুখে কুলুপ এঁটে দিয়েছে।

তুরস্ক কী পেল?

তুরস্ক আসলে বাস্তবিক অর্থে তেমন কিছুই পায়নি। আজারবাইজান এবং তুরস্ক শুরু থেকেই শান্তিরক্ষী মিশনে তুরস্কের সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দিয়ে আসছিলো। কিন্তু সর্বশেষ চুক্তিপত্রে তুর্কি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে কিছু বলা হয়নি। যদি আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট আলিয়েভ জানিয়েছেন যে শান্তিরক্ষী মিশনে তুর্কি সেনাবাহিনীও থাকবে। কিন্তু আমি যথেষ্ট কনভিন্সেড না।

তবে তুরস্কের সীমান্ত সংলগ্ন আজারবাইজানের ভূখণ্ড নাখচিভান ছিটমহল থেকে আর্মেনিয়ার মধ্য দিয়ে আজারবাইজানের মূল ভূখণ্ডে একটি করিডোর করার অনুমতি দেওয়া হয় এই নতুন চুক্তিতে।

এই করিডোরের মাধ্যমে তুরস্ক থেকে আজারবাইজানে যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন অনেক সহজ হবে। আগে স্থল পথে আজারবাইজানে যেতে জর্জিয়ার উপর দিয়ে কয়েক হাজার কিলোমিটার পথ পারি দিতে হত।

তবে তুরস্কের সবচেয়ে বড় পাওয়া হল বিশ্বজুড়ে তার সামরিক শক্তির প্রদর্শনী। তুরস্ক সিরিয়া, ইরাক এবং লিবিয়ার পরে তুরস্ক আবারও প্রমাণ করল যে আঙ্কারা যার সাথে থাকে তাকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু দিয়ে সহযোগিতা করে। আর তুরস্কের অস্ত্র ও রণকৌশলের কাছে ছোটখাট দেশের সেনাবাহিনী দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখেনা।

এছাড়াও এই বিজয়ের মাধ্যমে তুরস্ক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আর্মেনীয় লবির কাছে পরাজিত হওয়ার বদলা নিলো।

আর আর্মেনিয়া শুধু মাত্র যুদ্ধের ময়দানেই হারেনি, দেশটির প্রধানমন্ত্রী এখন দেশের ভিতরে এবং বাইরে প্রচুর সমালোচনা এবং বিশাল চাপের মুখে আছেন। হয়তবা খুব শিগ্রই দেশটিতে সরকার পরিবর্তনও হতে পারে।

লেখক: সারয়ার আলম, চিফ রিপোর্টার, আনাদলু নিউজ, তুরস্ক