Agaminews
Dr. Neem Hakim

মানসিক চিকিৎসার নামে ভন্ডামি এবং এর হাত থেকে মুক্তির উপায়


আবদুল্লাহ আল হাদী প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১৪, ২০২০, ১০:০৩ পূর্বাহ্ন /
মানসিক চিকিৎসার নামে ভন্ডামি এবং এর হাত থেকে মুক্তির উপায়

ইমন ইসলাম,জাবি প্রতিনিধি   :   আত্মমর্যাদাবোধ,অন্যের প্রতি আস্থা রেখে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি, গভীর অনুভূতি,অন্যকে ক্ষমা করে দেওয়ার শক্তিসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো মানসিক স্বাস্থ্যের বৈশিষ্ট্য।এ বৈশিষ্ট্য গুলোর অনুপস্থিতি হলো মানসিক রোগের অন্যতম লক্ষণ। মানসিক লক্ষণগুলো বা প্রক্রিয়াগুলোই মানুষের সকল ধরনের আচার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। মানসিক রোগের অন্যতম একটি লক্ষণ হলো নিউরো-ট্রান্সমিটারের ঘাটতি বা বাড়তি জনিত মানসিক প্রক্রিয়া।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানসিক চিকিৎসা দেওয়ার নামে, বিভিন্ন অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত ছোট বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যেখানে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কোন ডাক্তার,নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নেই। নেই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। মানসিক চিকিৎসা দেওয়ার নাম করে এই ভন্ড -প্রতারক গোষ্ঠী চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় মানুষদের অকথ্য নির্যাতন ও অমানুষিক অত্যাচার করে থাকে। সর্বোপরি এই প্রতিষ্ঠান গুলো টর্চার সেল বা নির্যাতন সেল হিসেবে গড়ে উঠেছে।

সর্বশেষ রাজধানীর আদাবরে মাইন্ড এইড সাইকিয়াট্রিস্ট অ্যান্ড ডি-অ্যাডিকশন নামের বেসরকারি হাসপাতালে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার আনিসুল করিমকে চিকিৎসার নাম করে পিটিয়ে হত্যা করেছে সেখানকার কর্মচারীরা।
প্রতিবছর এরকম ভন্ড -অসৎ চিকিৎসকদের পাল্লায় পড়ে শতশত মানুষ অকথ্য অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণায়, দেশে প্রায় সোয়া দু কোটি মানুষ কোন না কোন মানসিক রোগে আক্রান্ত।এই বিশাল সংখ্যক মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত হলেও এদের মধ্যে মাএ ১৫-২০ ভাগ লোক চিকিৎসা পাচ্ছে সঠিক ভাবে।

আমাদের দেশের অন্যতম একটি সমস্যা হলো পর্যাপ্তহারে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ না থাকা। বাংলাদেশের ৭৫ শতাংশ মানুষই গ্রাম-গঞ্জে বসবাস করে।আর বাংলাদেশের জেলা-উপজেলা গুলোতে ভালো প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মানসিক চিকিৎসক না থাকায়, চিকিৎসার জন্য তারা বিভিন্ন ওঝা, ফকির, কবিরাজের কাছে গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছে,নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।আর এই সুযোগে ওলি গলি, পথে ঘাটে, নামে-বেনামে মানসিক চিকিৎসা দেওয়ার নামে গড়ে উঠেছে শতশত প্রতিষ্ঠান।এছাড়া স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও কোন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নেই। এ কারণে মানুষ প্রয়োজনে চিকিৎসা নিতে পারছে না। ফলে অনেকেই ওঝা-পীর-ফকিরদের শরণাপন্ন হচ্ছেন, নিজেদের আরও বিপদে ফেলছেন। তাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিধি বাড়াতে হবে। যার জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।”

মানুষ উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে হতাশ হয়ে আত্মহত্যার মতো কঠিন মৃত্যুকে বরন করে নিচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্য গবেষক দের মতে
এই সকল ভন্ড প্রতারক চক্র কে নির্মূল করতে না পাড়লে ভবিষ্যৎ এ সাধারণ মানুষের বিপদ বাড়বে বই কমবে না।
মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে কোন রোগী নির্যাতনের শিকার হন এটা সাধারণ ধারণার বাহিরে। মানসিক চিকিৎসা দেওয়ার নামে গড়ে ওঠা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গুলো নিয়মিত পরিদর্শন, লাইসেন্স নবায়ন নীতিমালা সরকারের আছে।এই প্রক্রিয়াগুলো সঠিক ভাবে বাস্তবায়ন হলেই এসব প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম,অন্যায়-অত্যাচার নির্মূল করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো উচিত। দক্ষ জনবল নিয়োগের পাশাপাশি অবকাঠামো নির্মাণ, সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতি গড়ে তোলা, প্রতিটি হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্যর জন্য বিশেষ শয্যার ব্যবস্থা করা।
মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সু-স্পষ্ট ধারণা না থাকায় তাদের বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।যেমন ধরুন লোক লজ্জার ভয়, সমস্যা লুকিয়ে রাখা, মানুষকে কাজ থেকে বের করে দেওয়া, বিভিন্ন ভাবে হেনস্থা করা, মানসিক চাপে থাকা ইত্যাদি বিষয়গুলো লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ধরনের সমস্যা বেশি দেখা যায়।এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো মানসিক স্বাস্থ্য ও রোগ সম্পর্কে সমাজের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সচেতন করা।প্রয়জনে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার পাঠ দান করা।পোস্টার বিলি,মাইকে প্রচার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন সেমিনার,রেডিও,টেলিভিশনে বিভিন্ন মানসিক চিকিৎসা বিসয়ক প্রোগ্রাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতায়। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণা করার এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও এর থেকে উওরনের জন্য উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করা সমীচিন।

বাংলাদেশের সরকারের উচিত মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার জন্য ফ্রী স্কলারশীপের ব্যবস্থা করা,যাতে করে শিক্ষার্থীরা মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করে , দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে এবং সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার মাধ্যমে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে পারে।