Agaminews
Dr. Neem Hakim

পথশিশুদের জীবন ও তাদের হাসি-কান্না


আবদুল্লাহ আল হাদী প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১৩, ২০২০, ১১:৪৪ পূর্বাহ্ন /
পথশিশুদের জীবন ও তাদের হাসি-কান্না

ইমন ইসলাম,জাবি প্রতিনিধি  : 

 পথশিশু শব্দটিকে আলাদা করলে আমরা দুইটি শব্দ পাই।পথ ও শিশু,এক কথায় পথের শিশু (অর্থাৎ যে সকল শিশুদের বাসস্থান নেই,সমাজ থেকে বঞ্চিত,পথেই যাদের জন্ম,পথেই যাদের বেড়ে ওঠা,পথই যাদের জীবীকা ) এদেরকেই বুঝে থাকি।
বাংলাদেশ একটি ছোট্ট দেশ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি যার অর্ধেক লোকই দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে।মানব উন্নয়ন সূচকের ১৩৮ তম স্থানে বাংলাদেশের অবস্থান।

গবেষকদের ধারণা বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লক্ষ্য পথশিশু রয়েছে। সামাজিক স্তরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিম্ন স্তরে পথশিশুদের অবস্থান। পথশিশুরা সমাজে সবচেয়ে অবহেলিত, নিষ্পেষিত, সুবিধা বঞ্চিত।তারা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।

পথশিশুদের সিংহ ভাগই রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করে। তাদের নিজস্ব কোন বাসস্থান নেই, তারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, ফুটপাতে রাত কাটায়, রাস্তায় পড়ে থাকা পঁচা বাসি খাবার খেয়ে দিনপাত করে। তাদের পড়নে কাপর নেই।মাথার চুল উসকো-খুসকো।
কেউ বা ফুল বিক্রি করে,কেউ বা কাগজ কুরিয়ে জীবীকা নির্বাহ করে। পথশিশুরা অসুস্থ হলে দেখার কিংবা চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই।একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে সকল সুযোগ-সুবিধা, দরকার , পথশিশুরা সেই সকল অধিকার, সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

পথশিশুদের শিংহ ভাগই নিরক্ষর। পথশিশুদের জন্য আলাদা কোন স্কুল নেই।তারা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশে পথশিশুদের স্কুলে যাওয়ার সামর্থ্য নেই। তাই তাদের সঠিক শিক্ষা লাভের সুযোগ নেই। অথচ, এই শিশুদের জন্য শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তাদের যদি সঠিক শিক্ষা না থাকে, তাহলে তাদেরকে বাকি জীবনটাও দুর্বিষহভাবে কাটাতে হবে। তবে, কিছু এনজিও পথশিশুদের মাঝে শিক্ষার প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৫০,০০০ লক্ষ পথশিশু বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুবরণ করে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে।কারন পথশিশুরা নিরাপদ পানির অভাবে দূষিত পানি পান করে।

বিআইডিএস ও ইউনিসেফের এক গবেষণা বলছে—দেশে ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৭২৮ জন পথশিশু রয়েছে। কেবল ঢাকা শহরে রয়েছে ৭ লাখ পথশিশু। চলতি বছর শেষে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৫৪ জনে। আর ২০২৪ সাল নাগাদ সংখ্যাটা হবে ১৬ লাখ ১৫ হাজার ৩৩০ জন।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের গবেষণা থেকে জানা যায়—পথশিশুদের ৮৫ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবন করে। ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট এবং ৮ শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে থাকে। ঢাকা শহরে কমপক্ষে ২২৯টি মাদকের স্পট রয়েছে। এসব স্পটে ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুরা মাদক সেবন করে।
পথশিশুদের দ্বাড়া বিভিন্ন ছোট-বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। চুরি, পকেটমার, ছিনতাই,মাদক বিক্রি এর মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আসলে পথশিশুরা এর সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নয়। একটা গোষ্ঠী তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অসৎ উদ্দেশ্যে এই অসহায় পথশিশুদের ব্যবহার করছে,যা মোটেই কাম্য নয়। পথশিশুদের মৌলিক অধিকার, চাহিদা গুলো যদি পূরন করা যেত , তাহলে আজ এই পথ শিশুরা দেশের জন্য কল্যাণকর হতো। তাই একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উচিত দেশের সকল পথশিশুদের জন্য আলাদা একটি সমাজ গড়ে তোলা,যে সমাজে পথশিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাবস্থা থাকবে, নিরাপদ খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যবস্থা থাকবে সর্বোপরি মেধা বিকাশের সকল সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা থাকবে, তাহলেই এই পথশিশুদের মানব সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।

শিশুদেরকে একটি দেশের সম্পদ বলা হয়ে থাকে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আজকে যে শিশু আগামীতে সেই শিশু টি জাতীর কল্যাণে কাজ করবে , জাতিকে নেতৃত্ব দেবে।অথচ আজ সেই শিশুদের কি করুন অবস্থা। বাবা-মা নেই, পরিবার নেই, সমাজ থেকে বঞ্চিত হয়ে , দু মুঠো খাবারের আশায় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। পথশিশুদের এই বিশাল অংশ কে বাদ দিয়ে জাতির, দেশের উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। তাই আমাদের সবার উচিত পথশিশুদের পাশে দাঁড়ানো। তাদের কে বেঁচে থাকার যাবতীয় মৌলিক অধিকার গুলো ফিরিয়ে দিয়ে স্বাধীন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।

পথশিশুরাও মানুষ,তাদের হাসি-কান্না আছে, তাদের যেমন দুঃখ আছে তেমনি আনন্দ-বেদনা আছে। শুধু তারা তাদের আনন্দ, বেদনা প্রকাশ করার মানুষ পায় না।

বর্তমান বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সকল অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশেই পথশিশু রয়েছে।তাই বিশাল এই পথশিশুদের জন্য ছোট বড় অসংখ্য সংগঠন গড়ে উঠেছে। তারমধ্যে জাতিসংঘের ৬ টি সংগঠনের মধ্যে শিশুদের উন্নয়নে কাজ করে এমন একটি সংগঠন হলো ইউনিসেফ।এই সংগঠন টি প্রতিটি দেশের শিশুদের উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে।
সচেতন ব্যক্তি মহলের কাছে অনুরোধ, এসব ছিন্নমূল অসহায় পথ শিশুদের পাশে এসে দাঁড়ান, তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করুন, শিক্ষার ব্যবস্থা করুন,মানষিক বিকাশ লাভের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিন, তাহলে দেখবেন এরা উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণ করে দেশ গড়ার কাজে অংশ নিতে পারে। পথ শিশুদের আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে উঠলে ঠিকানাহীন নিরাশ্রয় এসব শিশুরা মানুষ হবে। দেশ হবে সমৃদ্ধশালী। দেশে নতুন করে আর কোন টোকাই, পিচ্চি সন্ত্রাসী সৃষ্টি হবে না।