শিশুদের নিউমোনিয়া -ডা. মোঃ সাইফুল আলম

বার্তাকক্ষবার্তাকক্ষ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৩:১৭ PM, ১৩ অক্টোবর ২০২০

নিউমোনিয়া ( Pneumonia) ফুসফুসের প্রদাহজনিত একটি রোগ।ফুসফুসে বিভিন্ন ধরণের ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস সংক্রামিত হয় যা শ্বাসযন্ত্রের উপর আক্রমণ করে, তখন এটিকে নিউমোনিয়া বলে। ফুসফুসে স্ট্রেপটোকক্কাস জাতীয় ব্যাকটেরিয়া কিংবা শ্বাসযন্ত্রের সিনসিশিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) সংক্রমণ ঘটালে ফুসফুস ফুলে ওঠে, ভরে ওঠে পুঁজে বা তরল পদার্থে, যা অক্সিজেন গ্রহণ করে নিঃশ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তখন ফুসফুসে প্রদাহ হয়। বিশ্বে প্রতি ৩৯ সেকেন্ডে একটি শিশুর মৃত্যু হয় নিউমোনিয়ায়।সেভ দ্য চিলড্রেনের ২০১৪ সালে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৭ হাজার শিশুর মৃত্যু হয় নিউমোনিয়ায়।

নিউমোনিয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ কারা?

বাচ্চা এবং বড়দের সবারই নিউমোনিয়া হতে পারে।

তবে ৫ বছরের কম বয়েসী বাচ্চাদের মধ্যেই এর প্রকোপ বেশি। দেখা গেছে যেসব বাচ্চা অপুষ্ট হয়ে জন্ম নিয়েছে,ওজন কম, বুকের দুধ খায়নি, টিকা ঠিকমত নেয়নি,

ঘন বসতিতে থাকে,স্যাঁতসেতে ঘরে বাস করে,যে ঘরে বড়রা ধূমপান করে তাদের মধ্যে এর প্রকোপ বেশি হয়।

নিউমোনিয়ার লক্ষণ কী?

• জ্বর

• কাশি 

• নাক দিয়ে পানি পড়া 

• শ্বাসকষ্ট 

• খাওয়া দাওয়া কমিয়ে দেওয়া

• দ্রুত নিশ্বাস এবং এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ পাঁজরের নিচের অংশ ভেতরের 

দিকে ডেবে যাওয়া।

 

জীবাণু দিয়ে শ্বাসনালী আক্রান্ত হলেই শরীরে প্রতিরোধ হিসাবে কাশি এবং জ্বর তৈরি করে। ভাইরাসের কারণে হলে সর্দি বা চোখ দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গও থাকতে পারে। এরপর অক্সিজেন এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডের এক্সচেঞ্জ বাড়াতে শ্বাসের গতি বাড়িয়ে দেয়। এই শ্বাসের গতি ২ মাসের কমে ৬০ বা এরচেয়ে বেশি ১ বছরের নিচে ৫০ বা তারচেয়ে বেশি এবং ৫ বছরের নিচে ৪০ বা তার চেয়ে বেশি হলে নিউমোনিয়ার কারণের এই দ্রুত শ্বাসকষ্ট হচ্ছে বলে ধরা হয়।

 

নিউমোনিয়ার চিকিৎসা কি?

সাধারণ নিউমোনিয়ার চিকিৎসা বাড়িতেই সম্ভব। তবে শিশুকে এ সময় ওষুধের পাশাপাশি প্রচুর তরল খাবার ও পুরোপুরি বিশ্রামে থাকতে হবে।

• নাক বন্ধ থাকলে নরমাল স্যালাইন ড্রপ (নরসল/সলো ড্রপ) দিতে হবে। তবে অন্য কোনো ওষুধজাতীয় ড্রপ দেয়া যাবে না।

• বুকে তেল অথবা বামজাতীয় কোনো কিছু ব্যবহার করা যাবে না।

• প্রয়োজন না থাকলে সাকশন যন্ত্র ব্যবহার করে কফ পরিষ্কার করা বা সামান্য কাশিতেই নেবুলাইজেশন করা সমীচীন নয়। নিউমোনিয়া ভালো হতে ২-৩ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

• তবে অবস্থা সংকটাপন্ন হলে শিশুকে অবশ্যই হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

 

শিশুকে কখন হাসপাতালে নেয়া আবশ্যক?

• খুব বেশি শ্বাস কষ্ট হলে

• সব কিছুই বমি করে ফেললে

• শিশু অজ্ঞান হয়ে গেলে অথবা শিশুর খিঁচুনি হলে।

 

প্রতিরোধে করণীয় কী?

নিউমোনিয়া একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। শিশু জন্মের পর একটু সতর্কভাবে কিছু পরামর্শ মেনে চললে শিশুদের রক্ষা করা যায় নিউমোনিয়া থেকে। বিশেষ করে:

• জন্মের পর শালদুধ ও পূর্ণ দুই বছর বুকের দুধ পান নিশ্চিত করা।

• পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, বিশেষ করে সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করা।

• শীতকালে শীত উপযোগী হালকা ও নরম গরম কাপড় ব্যবহার করা।

• অসুস্থ লোক, বিশেষ করে হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত লোকের সামনে শিশুদের যেতে না দেওয়া।

• আবদ্ধ ঘরে বসবাস না করা।

• চুলার ধোঁয়া, মশার কয়েল ও সিগারেটের ধোঁয়া থেকে দূরে রাখা।

• সুষম ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া, ভিটামিন ‘এ’ ও ‘ডি’ গ্রহণ।

• শিশু জন্মের পর ইপিআই শিডিউলের সব টিকা দেওয়া, বিশেষ করে বিসিজি, পিসিভি (নিউমোকক্কাল কনজোগেইট ভ্যাক্সিন), হিব (হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েনজি টাইপ বি ব্যাকটেরিয়া) টিকা নেওয়া।

 

লেখক: ডা.মোঃ সাইফুল আলম। এম.ডি. (রুদেন ইউনিভার্সিটি) মস্কো, রাশিয়া।

আপনার মতামত লিখুন :