করোনা ও সডোম নগরী -ডা. আরিফুর রহমান

বার্তাকক্ষবার্তাকক্ষ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০২:৫৬ PM, ১৩ অক্টোবর ২০২০

বিশেষ প্রবন্ধ
একজন ভদ্রমহিলা আল্লাহর হুকুম মেনে বিয়ে করায় দেশের কিছু মানুষের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিলো গত কয়েকদিন। চারটি বিয়ে করার অতি গোপন আকাঙ্খা মনে মনে লুকিয়ে রাখা পুরুষটিও ঘুম শেষে হাই তোলার সময় হাউ মাউ আওয়াজ উঠায়,– তিনটে বিয়ে করার দরকারটা কি!!

একজনের বিয়ের খবরে ফেসবুক কাঁপানো পোস্টগুলির ব্যাখ্যায় বলতে পারি, কারো হালাল খুশিতে বাগড়া দেয়ার গর্বিত জাতি আমরা।

আজকে একটি পত্রিকায় দেখলাম, তিনি জানিয়েছেন, তাঁর বিয়ে নিয়ে তিনি নিজে খুব খুশি। তাঁর বিয়ের সংবাদ এইরকম সাড়া পাবে তা তিনি নিজেও ভাবতে পারেন নি। সংবাদটি পড়ে ভালো লেগেছে। যারা জীবনের সবকিছুকে পজিটিভলি নেয় তারা আত্মপ্রত্যয়ী মানুষ। বালিকার নিরবিচ্ছিন্ন সুখ কামনা করছি।

তবে একজন নির্বাসিতা লেখিকার ফেসবুক কলামে দেখলাম, তিনি একধাপ এগিয়ে প্রশ্ন রেখেছেন, — উনি তাহলে আবার পুরুষ বিয়ে করলেন কেন? তাঁর মতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষ বিয়ে করাই ঠিক না। অথচ যতদূর জানি উনিও বিভিন্ন সময়ে একাধিক পুরুষকে অফিসিয়াল বিয়েই করেছিলেন।

অনেক বছর আগে প্রথম টরন্টো ভিজিটে আমাদের ভাড়া এপার্টমেন্টের লিফটে নীচে নামতে যাবো, তখন একজন বুড়ো বাপ লিফট আটকে দিয়ে আমাকে বললেন, একটু হোল্ড করি? আমার ওয়াইফ কুকুর নিয়ে আসছে।

আমার পাশের এপার্টমেন্টের দরজা খুলে তার ছেলে বা নাতী গোছের সুদর্শন এক ছোকরা তিনটি কুকুর নিয়ে লিফটে ঢুকলে বুড়োটি লিফটের দরজা বন্ধ করার বাটন টিপে দিলো।

বুড়ো ভুল করেছে মনে করে আমি আবার খোলার বাটন টিপে দিয়ে বললাম,– তোমার ওয়াইফ তো এখনো আসেনি।

ছোকরা আমার চোখে চোখ মেরে বললো আমি আর রিচার্ড স্বামী-স্ত্রী–আমি লিফটে এসে গেছি।

অবাক হয়ে জীবনে সেদিন প্রথম জেনেছিলাম পুরুষ পুরুষকে বিয়ে করে, সংসারও করে, আবার আমার পাশের ফ্লাটেই বসবাস করে। নারীরাও নারীকে বিয়ে করে তবে যে নারীটি স্বামী হয় সে সাধারণত: মাথা নেড়ে করে ফেলে বা ছেলেদের মতো চুল ছোট করে কাটে। ছেলে বউটি বাম কানে ফুটো করে একটি দুল জাতীয় কিছু লাগায়। দিলীপ কুমার মোগলে আজম ছবিতে অবিশ্যি দুই কানে ফুটো করে দুটি দুল পড়েছিলেন ইয়ং বাদশা আকবরের অভিনেতা হিসাবে। পরিচালক কি বুঝিয়েছিলেন, জানি না।

যে যা খুশি কাটুক বা যা কিছু ফুটো করুক, সমলিঙ্গের বিয়ে এখন পশ্চিমা দেশ ও ইউরোপে আইনত: ফুল বয়েলড বা পুরোপুরি সিদ্ধ। সব রকমের অস্বাভাবিক যৌনতা যারা পছন্দ করে তাদের নাম ইংরেজিতে এলজিবিটিই দল। এদের মনোগ্রাম রংধনু, সব রংয়ের মানুষ একরঙ্গে মিলে যায় এখানে, এইটি তাদের থিম।

গল্প এখানে শেষ হলে কথা ছিলোনা। নীচে নেমে অপেক্ষারত আমার ছেলেকে বললাম লিফটের ঘটনাটি।

ছেলে বললো, বাবা, তুমি কুকুর নিয়ে কোন প্রশ্ন করোনি তো? আমি বললাম, না একটা কুকুর যেভাবে আমার দিকে কটমট করে পুলিশের মতো সন্দিহান চোখ নিয়ে তাকিয়ে ছিলো, আবার প্রশ্ন!

ছেলে বললো, ভালো করেছো। ওদের তিনটি কুকুর আসলে ওদের এক ছেলে ও দুই মেয়ে!

আমি অবাক হয়ে বললাম, কানাডায় পুরুষ পুরুষে বিয়ে হয় বুঝলাম, আবার তাদের বাচ্চাও হয়? তাও আবার কুকুর বিড়াল? কানাডার ডাক্তাররা কোন টেস্টটিউব টেকনিক ইউজ করে জানিস?

ছেলে বললো, আব্বু তোমার বরিশালী আইডিয়া বাদ দাও, এই দেশে ওরকম না। ওরা কুকুর বেড়ালকে ওদের নিজেদের ছেলে মেয়ে মনে করে। ওদের যদি একটা পালিত বা সারোগেট মানুষ সন্তান থাকতো আর ওদের বাসায় বেড়াতে গিয়ে যদি তাকে জিজ্ঞেস করো, তোমরা কত ভাইবোন?
ওরা বলবে চারজন। কিন্তু বাসায় দেখবে মানুষ ভাই হচ্ছে ছেলেটা নিজে, আর বাকি তিন ভাই বোন সব কুত্তা।
আমি বললাম, এরকম বাসায় শুঁটকি ভর্তার দাওয়াত দিলেও আমি যেতাম না।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বিরোধী নির্বাসীতা লেখিকা কিন্তু খেয়াল করেননি পৃথিবীর অনেক দেশ আসলে নারীতান্ত্রিক দেশ হয়ে গেছে। নারীদের কথায় দেশের, ঘরের সবকিছু চলে। পৃথিবীতে কোথাও একজন সংসারী পুরুষ খুঁজে পাইনা যে নিজের কথায় বা নিজ মন মতো চলতে পারে। পুরুষটি যতই কামাই রোজগার করুক হুকুম চলে বউয়ের। তাই মনে হয় বিলিওনিয়ার মুকেশ আম্বানী বউকে জন্মদিনে জেট প্লেন উপহার দেয় আর তাঁর নিজের জন্মদিন পালন করে একটা মোমবাতি ফু দিয়ে।

আমাদের ছোটবেলায় শিক্ষিকা, সন্মানিতা নারীদের আমরা ম্যাডাম ডাকতাম। সেদিন এক উচু লেভেলের নারী অফিসারকে ম্যাডাম সম্বোধন করায় তাঁর সেক্রেটারি আমাকে একমিনিট বলে রুমের বাইরে ডেকে নিয়ে বললেন, ডাক্তার সাহেব, ম্যাডামকে আজকাল ম্যাডাম বলেনা, স্যার বলতে হয়।

আমি বললাম সর্বনাশ, জেন্ডার রুল নিয়ে কোন চেঞ্জের কথা আমার জানা নেই, মাফ করবেন।

তিনি বললেন, কোন বিষয় না, বিদেশ থেকে আসছেন আস্তে ধীরে শিখে নেবেন।

আমি দরজা খুলে আবার বলে ফেললাম, –ভেতরে আসতে পারি ম্যাডাম স্যার?

ভদ্রমহিলা মুখ গম্ভীর করে বললেন, না, আমার এখন মিটিং আছে। বুঝলাম নিজের বারোটা নিজে বাজিয়েছি, তাড়াহুড়ো করে মহিলা অফিসারকে একসাথে স্যার ও ম্যাডাম বলায় উনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

চিন্তা করে দেখলাম নির্বাসীতা লেখিকার দোষ কি? পৃথিবীর মানুষেরা যা চায় সেভাবেই চলতে হবে। কুকুর বেড়াল ভাই–ভাই, মানুষ কুকুর বাপ–মেয়ে এগুলি মেনে নিয়ে পৃথিবী চলতে শুরু করেছে, চলবে।

নবী ইব্রাহীম (আ) এর আপন ভাতিজা লুত (আ) নবী এসেছিলেন অতি উন্নত ও ধনী সডোম ও গোমরাহ অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্যে। তারাও ঠিক বর্তমান পৃথিবীর এলজিবিটি সোসাইটির মতো বিভ্রান্ত যৌনতায় আচ্ছন্ন ছিলো। তখন আল্লাহ সতর্ক করেছিলেন নবীকে দিয়ে, কিন্তু পাপ না ছাড়ায় শহর দুটিকে ফেরেশতারা উল্টিয়ে দিয়েছিলেন আল্লাহর হুকুমে, সেই উল্টানো এলাকাটি এখন ডেড সী নামে পরিচিত।

বোঝার বিষয় হলো, আল্লাহ কিন্তু এখন করোনা ভাইরাস দিয়ে পুরো পৃথিবীকে উল্টিয়ে দিয়েছেন লুত নবীর শহরের মতো। আল্লাহই জানেন, লুত নবীর সময়ের মতো সেই দুজন ফেরেস্তা করোনা ভাইরাস ছেড়ে দিয়ে গেলো কিনা। নাহয় এখনো আমরা কেন নিশ্চিত ভাবে বলতে পারছিনা এই ভাইরাসের উৎপত্তি কোথা থেকে। সব অনুমান ভিত্তিক তথ্য দিয়ে চাইনিজ প্যাঙ্গলিন অথবা ল্যাব-মিসটেককে দায়ী করে যাচ্ছি আমরা।

অথচ যাদের চোখ আছে তাঁরা কিন্তু ঠিকই দেখতে পাচ্ছে, যাদের বোঝার যোগ্যতা আছে তাঁরা ঠিকই বুঝতে পারছে, পুরো পৃথিবী আগের অবস্থানে নেই, সব কিছু লুত নবীর শহরের মতো উল্টো হয়ে গেছে।

যাদের চোখ নেই, তারা কোনদিন দেখবেনা, যাদের বোঝার যোগ্যতা নেই তাঁরা কোনদিন বুঝবেনা, পাপাচার চালিয়েই যাবে সর্বোতভাবে– লুত নবীর গোত্রের মতো নিজেরা ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত।

ছবি: ডেড সি এর পাড়ে এই পাথুরে স্তম্ভটির নাম লুতের স্ত্রী, যিনি লেসবিয়ান হিসাবে আল্লাহর গজবে অন্যদের সাথে মারা গিয়েছিলেন।

আপনার মতামত লিখুন :