স্তন ক্যান্সার শনাক্তকরণে আপনার হাতেই হোক প্রথম হাতিয়ার – ডাঃ মোঃ সাইফুল আলম

বার্তাকক্ষবার্তাকক্ষ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১২:৫৮ AM, ১০ অক্টোবর ২০২০

আজ ১০ই অক্টোবর, বাংলাদেশে এই দিনটি “স্তন ক্যান্সার সচেতনতা” দিবস পালন করা হয়। যদিও পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই পুরো অক্টোবর মাসই স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাস হিসেবে পালিত হয়।
স্তন ক্যান্সারে নারীদের মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এই ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। উন্নত বিশ্বে শতকরা ৬৫ ভাগ স্তন ক্যান্সার ধরা পড়ে একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে। এ কারণে সেখানে ব্রেস্ট ক্যান্সার জনিত মৃত্যু অনেকটা কমে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।বিগত পাঁচ বছরে আমাদের দেশে ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া ও রোগ শনাক্ত হওয়ার হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আমাদের দেশে দেরীতে ও শেষ পর্যায়ে ডায়াগনোসিস হওয়া আর দেরিতে চিকিৎসা নিতে আসার পেছনে অন্যতম কারণ রোগী ও তার পরিবারের এই বিষয়ে অজ্ঞতা ও অসচেতনতা এবং ব্রেস্ট ক্যান্সারের নিয়মিত স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম-এর স্বল্পতা।
স্তন ক্যান্সার কেনো হয় তার নির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনও জানা যায়নি। তাই একাধিক কারণকে স্তন ক্যান্সারের জন্য দায়ী করা হয়ে থাকে, যেমন:
যেসব নারীর বয়স ৪০ বছরের বেশি তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। স্তন ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে অর্থাৎ মা-খালাদের থাকলে সন্তানদের হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। অবিবাহিতা বা সন্তানহীনা নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যেসব মায়েরা সন্তানকে কখনও স্তন্যপান (breast feeding) করাননি তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ৩০ বছরের পরে যারা প্রথম মা হয়েছেন তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যাদের তুলনামূলক কম বয়সে মাসিক শুরু হয় ও দেরিতে মাসিক বন্ধ (menopause) হয় তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। একাধারে অনেকদিন (১০ বছর বা বেশি) জন্ম নিরোধক বড়ি খেলেও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে?
স্তনে চাকা বা পিণ্ড দেখা দিলে স্তনের বোঁটার কোন ধরনের পরিবর্তন, যেমন ভেতরে ঢুকে গেলে, অসমান বা বাঁকা হয়ে গেলে স্তনের বোঁটা দিয়ে অস্বাভাবিক রস বের হলে স্তনের চামড়ার রং বা চেহারায় পরিবর্তন হলে বাহুমূলে পিণ্ড বা চাকা দেখা গেলে ব্রেস্ট ক্যান্সারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা: ম্যামোগ্রাম এক বিশেষ ধরনের এক্স রে যন্ত্র যাতে স্তনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়ে। বয়স ৩০ হবার পর সব নারীর উচিত নিয়মিত নিজের স্তন পরীক্ষা করে দেখা। এজন্য মূলত তিনটি পদ্ধতি প্রচলিত আছে। • ম্যামোগ্রাম বা বিশেষ ধরনের এক্স রে, যার সাহায্যে স্তনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়ে। • সুনির্দিষ্ট নিয়মে চাকা বা পিণ্ড আছে কিনা, চিকিৎসকের মাধ্যমে সে পরীক্ষা করানো। • নিজে নিজে নির্দিষ্ট নিয়মানুযায়ী স্তন পরীক্ষা করা।
কীভাবে নিজে পরীক্ষা করবেনঃ স্তন পরীক্ষা করার অনেকগুলো উপায় আছে। নিয়মিত পরীক্ষা করাটাকে রুটিন বানিয়ে ফেলুন, তাহলে আর ভুল হবে না। প্রত্যেক মাসে অন্তত এক বার, কয়েক মিনিট সময় ব্যয় করে পরীক্ষা করুন নিজের স্তন ঠিক আছে কী না।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পরীক্ষা: আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাত দুটো পাশে রাখুন, ভাল করে লক্ষ্য করুন স্তনের চামড়ায় কোন পরিবর্তন কিংবা আকারে কোনো বদল এসেছে কী না। এবার দুই হাত কোমরে রেখে বুক সামনের দিকে চিতিয়ে দেখুন স্তনে কোনো ধরনের দাগ, ঘাঁ কিংবা গর্ত আছে কী না। এবার হাত দুটো উঁচু করে আরো একবার পরীক্ষা করুন।
গোসলের সময় পরীক্ষা: একটি হাত মাথায় রাখুন। আরেকটি হাতের আঙুল দিয়ে কলার বোনের কয়েক ইঞ্চি নিচ থেকে একদম বগল পর্যন্ত চেপে দেখুন, পুরো স্তনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চক্রাকারে পরীক্ষা করতে থাকুন, প্রথমে হালকাভাবে, পরে একটু চাপ দিয়ে স্তনের টিস্যুগুলো পরীক্ষা করুন। এভাবে একদম স্তনবৃন্ত পর্যন্ত পরীক্ষা করতে হবে। দুই স্তনেই পরীক্ষা করুন।
শুয়ে শুয়ে পরীক্ষা: বিছানায় শুয়ে ডান দিকের কাঁধের ওপর একটি বালিশ রাখুন। ডান হাত মাথার পেছনে দিন। এবার বাম হাতের আঙুল দিয়ে চক্রাকারে ডান পাশের স্তন পুরোটা পরীক্ষা করুন। স্তনবৃন্ত চেপে ধরে নিশ্চিত হয়ে নিন কোনো তরল নিঃসৃত হচ্ছে কী না কিংবা কোনো ধরনের অস্বাভাবিক ব্যাপারে আছে কী না। একইভাবে এবার বাম পাশের স্তন পরীক্ষা করুন।
ব্রেস্ট ক্যান্সারের চিকিৎসা: “প্রাথমমিক (ফার্স্ট স্টেজ) বা দ্বিতীয় পর্যায়ে (সেকেন্ড স্টেজ) ধরা পড়লে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীকে বাঁচানো সম্ভব। তৃতীয় পর্যায়ে (থার্ড স্টেজ) চিকিত্সা শুরু করতে পারলেও প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব। এমনকি একেবারে অন্তিম পর্যায়ের শুরুতেই (ফোর্থ/লাস্ট স্টেজ) চিকিত্সা শুরু করতে পারলে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। তাই স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া মানেই রোগীর বাঁচার আর কোনও আশা নেই— এমনটা ভেবে নেওয়ার কিন্তু কোনও কারণ নেই!”
এছাড়া যে বিষয়গুলি খেয়াল রাখা জরুরি তা হলো ৩০ বছর বয়সের মধ্যে প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার চেষ্টা করা, সন্তানকে বুকের দুধ পান করানো, কোনো ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে সাথে সাথে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া, ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করা, টাটকা শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম/পরিশ্রম করা।
লেখকঃ ডাঃ মোঃ সাইফুল আলম। এম.ডি. (রুদেন ইউনিভার্সিটি) মস্কো রাশিয়া।

আপনার মতামত লিখুন :