সুচিকিৎসায় যক্ষ্মা ভালো হয় – ডা. মোঃ সাইফুল আলম

বার্তাকক্ষবার্তাকক্ষ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০১:৩২ PM, ০৬ অক্টোবর ২০২০

যক্ষ্মা (Tuberculosis বা টিবি) একটি সংক্রামক রোগ। মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস (Mycobacterium tuberculosis) নামক একটি জীবাণু এই রোগের জন্য দায়ী। ২০১৪ সালের জরিপ মতে, বিশ্বে প্রতিবছর ৯৬ লাখ লোক সক্রিয় যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়, যাদের মধ্যে ১৫ লাখই মারা যায়। বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে তিন লাখ লোক যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়, এর মধ্যে ৭০ হাজার মারা যায়।

যক্ষ্মা দুই ধরনের।

চিকিৎসা শাস্ত্রের ভাষায় এদের বলা হয় Pulmonary TB ফুসফুসের যক্ষ্মা এবং Extra-Pulmonary TB বা ফুসফুস বহির্ভূত যক্ষ্মা। তবে ফুসফুসের যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। মোট যক্ষ্মা রোগীর শতকরা ৮৫ ভাগই ফুসফুসের যক্ষ্মা রোগী। ফুসফুসের যক্ষ্মা আবার দুই ধরনের কফে জীবাণুযুক্ত যক্ষ্মা রোগী (স্পুটাম স্মিয়ার পজেটিভ) এবং কফ জীবাণুযুক্ত যক্ষ্মা রোগী (স্পুটাম স্মিয়ার নেগেটিভ )। এই দুই গ্রুপের মধ্যে কফে জীবাণুযুক্ত যক্ষ্মা রোগীরাই মারাত্মক সংক্রামক। এদের ফুসফুস থেকে নির্গত যক্ষ্মা জীবাণু বাতাসের সাহায্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সুস্থ লোকের শরীরে প্রবেশ করে এবং নানা ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার পর এদের মধ্যে কেউ কেউ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়। চিকিৎসার আওতায় আসেনি এমন একজন কফে জীবাণুযুক্ত যক্ষ্মা রোগী

বছরে কয়েকজন করে নতুন যক্ষ্মা রোগীর জন্ম দেয়। এভাবে সমগ্র কমিউনিটির মধ্যে যক্ষ্মা রোগ ছড়িয়ে পড়ে।

 

যক্ষ্মার লক্ষণ:

পালমুনারি টিবি বা ফুসফুসের যক্ষ্মার স্থানীয় লক্ষণ : কাঁশি, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, গলা দিয়ে রক্তক্ষরণ। তবে গলা দিয়ে রক্তক্ষরণ হলেই যক্ষ্মা হয়েছে এমন ধারণা সঠিক নয়। এটা নানা কারণে হতে পারে। কিন্তু কাঁশি এমন একটি উপসর্গ যা ফুসফুসের যক্ষ্মায় কোন না কোন সময় হবেই।

Extra Pulmonary TB ফুসফুস বহির্ভূত যক্ষ্মার স্থানীয় লক্ষণ। শরীরের অঙ্গ ভেদে এই লক্ষণ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে :

কিডনি : মাঝে মাঝে পেটের পেছনের দিকে কিডনির অবস্থানে ব্যথা হয়। পেশাবের সঙ্গে রক্তপাত হতে পারে তব অনেক সময় তা খালি চোখে দেখা যায় না। পেশাবে জ্বালাপোড়া ও ঘন ঘন পেশাব হয়।

অন্ত্র ও খাদ্যনালী : ক্ষুধামন্দা, বদহজম, পেটফাঁপা, পেটব্যথা, পেটের মধ্যে বুটবাট শব্দ করা কখনও পাতলা পায়খানা, খাবারে অরুচি ইত্যাদি। সাধারণ চিকিৎসায় এগুলো উপশম হয় না।

জয়েন্ট, হাড় ও শিরদাড়া : এগুলো ফুলে যায়, ব্যথা হয়, শিরদাড়া বাঁকা হয়ে যেতে পারে।

চামড়া : চামড়ায় যক্ষ্মা হলে চামড়া ফুলে যায়, লাল হয়ে ওঠে, ঘা হয় এবং কালো কালো দাগ পড়তে পারে। ঘা এর মাঝখানটা নিচু থাকে।

 

যক্ষ্মার পরীক্ষা-নিরীক্ষা:

যক্ষ্মা হলেও অনেক সময় তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তবে ঘুসঘুসে জ্বর,ওজন হ্রাস ইত্যাদি কারণে সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে কিছু পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে দেখা উচিত। এ রকম কিছু পরীক্ষা- নিরীক্ষা হলো: বুকের এক্স-রে, শ্লেষ্মা পরীক্ষা, শ্লেষ্মার কালচার ও সেনসিটিভিটি, Xpert MTB/RIF, মানটো পরীক্ষা, ব্রংকোসকপি, সিটি স্ক্যান চালিত এফএনএ, AFB Stain বা কালচার, এডিনোসাইন ডিএমাইনেজ (এডিএ), সেরোলজিক্যাল টেস্ট ইত্যাদি।

 

যক্ষ্মা প্রতিরোধে করণীয়:

যক্ষ্মা বা টিবি রোগের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে একজন সুস্থ ব্যক্তিকে কিছু বিষয়ে সাবধান হতে হবে।

যেমন:

• জন্মের পর পর প্রত্যেক শিশুকে বিসিজি টিকা দিতে হবে।

•হাঁচি কাশি দেওয়ার সময় অবশ্যই রুমাল ব্যবহার করতে হবে।

•থুতু কফ নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে এবং হাঁচি-কাশির পরে সাবান দিয়ে হাত ভালোমতো ধুয়ে ফেলতে হবে।

• পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

• বাসস্থানের পরিবেশ খোলামেলা, আলো-বাতাস সম্পন্ন হতে হবে।

• জনাকীর্ণ পরিবেশে বসবাস যথাসম্ভব পরিহার করতে হবে।

• ডায়াবেটিস জাতীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসকারী রোগের ক্ষেত্রে, সুষ্ঠু চিকিৎসা নিতে হবে।

• যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগীকে সবসময় নাক মুখ ঢেকে চলাচল করতে হবে।

• যক্ষ্মা জীবাণুযুক্ত রোগীর সঙ্গে কথা বলার সময় একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

• রোগী জীবাণুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত রোগীকে অন্য সবার থেকে একটু আলাদা রাখতে হবে।

 

যক্ষ্মার চিকিৎসা:

একসময় বলা হতো, ‘যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই।’ তবে এখন বলা হচ্ছে, ‘যক্ষ্মা ভালো হয়।’ পর্যাপ্ত চিকিৎসায় প্রায় সব রোগী নিরাময় লাভ করে।

 

বাংলাদেশের সকল- উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, বক্ষব্যাধি ক্লিনিক/হাসপাতাল, নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র, এনজিও ক্লিনিক ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সমূহে বিনামূল্যে কফ পরীক্ষা, রোগ নির্ণয়সহ যক্ষার চিকিৎসা করা হয় ও ঔষধ দেয়া হয়।

ডা. মোঃ সাইফুল আলম।(এম.ডি) রুদেন ইউনিভার্সিটি।মস্কো,রাশিয়া।

আপনার মতামত লিখুন :