কোন ওসির চেয়ার ২৪ ঘন্টাও না থাকতে পারে : সিএমপি কমিশনার

বার্তাকক্ষবার্তাকক্ষ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১১:৪৯ AM, ০৩ অক্টোবর ২০২০

মো: মহসিন, বিষেশ প্রতিনিধি চট্টগ্রাম  সাধারণত থানার একজন ওসির বদলি বা প্রত্যাহার পুলিশ সদর দপ্তরের আদেশ ছাড়া ১৮ মাসের আগে হয়না। তবে অনেকে তার বেশি সময়ও থাকেন আবার অনেকে আরও কম সময়ও ওসি পদে থাকেন। কিন্তু সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেছেন, ‘ওসির মেয়াদ নিয়ে একটা গাইড লাইন থাকলেও আমি মনে করি দায়িত্ব পেলেই যে ১৮ মাস বা ২৪ মাস থাকবে সেটা ঠিক না। আমার কাছে তার কাজই ওসির মেয়াদের আসল মানদণ্ড। কোনও ওসির চেয়ার ২৪ ঘণ্টাও না থাকতে পারে আবার কোনও ওসির চেয়ার ২৪ মাসেরও বেশি থাকতে পারে। সব কিছু ডিপেন্ড করছে তার কর্মকাণ্ডের ওপর। সিএমপিতে কেউ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ওসি পদে থাকবে সেটা ভেবে থাকলে ভুল হবে। যে কোনও সময় যে কারো চেয়ার পরিবর্তন হতে পারে।’

গত শুক্রবার দুপুরে নিজ কক্ষে সিভয়েসের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় সিএমপির ৩০ তম কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া সালেহ মোহাম্মদ তানভীর এসব কথা বলেন। গত ৭ সেপ্টেম্বর পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন ৩২ মাস আগে অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া নগর পুলিশের নতুন এ অভিভাবক।

দায়িত্ব নেওয়ার পর সাংবাদিকদের সামনে এসে জানিয়েছিলেন নানা পরিকল্পনার কথা। শুনিয়েছিলেন সিএমপিতে পরিবর্তনের কথা। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সিএমপির প্রত্যেক সদস্য হবে জনবান্ধব আর থানা হবে পুলিশি সেবার মূল কেন্দ্রস্থল। অপরাধ করে কেউ যেমন পার পাবেনা তেমনি পুলিশ সদস্যরাও জবাবদিহিতার বাইরে থাকতে পারবে না।

পুলিশের পোস্টিং বাণিজ্য নিয়ে অনৈতিক লেনদের কথা অনেকটা ওপেন সিক্রেট। সেই বদনামি ঘোচাতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। যেই কথা সেই কাজ সম্প্রতি খুলশী ও আকবর শাহ থানার ওসি পদে দুজনকে পদায়নে লেনদেন হয়নি কোন অর্থ। এমনকি শুনা হয়নি কারো তদবিরও। সম্পূর্ণ পেশাদার চৌকস দুই পরিদর্শককে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পদায়ন করেন পুলিশ কমিশনার।

বিষয়টি স্বীকার করে সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি আমি এসব নিয়ে মুখে কিছু বলব না। আমার কাজই সব বলবে। তাই দুই ওসি পদে পদায়নের ক্ষেত্রে কোনও তদবির বা অনৈতিক লেনদেন করা হয়নি।’

এর ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব নিয়ে দুই ওসিই আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। আমি তাদের স্পষ্টই বলেছি আপনাদের সাথে যেহেতু কোনও লেনদেনের সম্পর্ক নেই৷ সেহেতু আমি যে দায়িত্ব দিয়েছি সেই আমানতের যদি খেয়ানত করেন চেয়ার ২৪ ঘণ্টাও থাকবেনা। আমি প্রতিদিনই ওসিদের বিষয়ে মূল্যায়ন করি। যে আমার হিসাবে ফেল করবে তাকেই প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। আর যে পাস করবে তার চেয়ার থাকবে। এখানে ২৪ ঘণ্টা মেয়াদ আর ২৪ মাস মেয়াদ সেটা কোনো বিষয় না।’

ওসি পদে পদায়নে অনৈতিক তদবির বা লেনদেন বন্ধ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও এখনো পুলিশের বিভিন্ন স্তরে অনৈতিক লেনদেন হয় বলে অভিযোগ আছে৷ পুলিশ কমিশনারের অধীনস্তদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে ফাঁড়ির আইসি পদায়ন, এসআইদের থানায় পদায়নসহ নানা অনুষ্ঠানের নামে থানা পুলিশের বাড়তি টাকা খরচ হয়। যা পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বরাদ্দ থাকেনা। ফলে অনৈতিক পথেই বা বিভিন্নজন থেকে সুবিধা নিয়ে তা সামলাতে হয় ওসিদের ৷ এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিএমপির এ অভিভাবক বলেন, ‘শীর্ষ পদে থেকে যখন আমি এসব অনৈতিক কাজে নেই। তাহলে আমার অধীনস্থদেরও সেই সুযোগ নেই। আপনার কথা যদি সত্য হয়ে থাকে সেটা আগামীতে করার আর সুযোগ থাকবে না। সিএমপির আমূল পরিবর্তন আসবে। তার জন্য অন্তত চারটি মাস সময় দিন।’

কক্সবাজারে গণ বদলির পর সিএমপিতেও সেই বদলির ঢেউ লেগেছে বলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে দুই ওসি সহ বেশ কয়েকজন এসআই কনস্টেবলকে বদলি করা হয়েছে। তাহলে কি ব্যাপকহারে বদলি হচ্ছে সিএমপিতেও। এর জবাবে পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘বিষয়টা সেরকম না। বদলি একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর সবার আমলনামার খোঁজ খবর নিচ্ছি। যাদের বিষয়ে জানার দরকার তাদের সরাসরি ডেকে কথা বলছি। তাই সেভাবে গণহারে বদলি হবে কিংবা কেউ বদলি হবেনা তা বলা যাবেনা। আর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে যদি কেউ বদলি হয় সেটা ভিন্ন বিষয়৷’

মাদকমুক্ত পুলিশ ইউনিট গড়তে কাজ শুরু করেছেন নতুন এ কমিশনার। ইতোমধ্যে সিএমপির সন্দেহভাহন সদস্যদের ডোপ টেস্টের মুখোমুখি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিকের বেশি পুলিশ সদস্যের ডোপ টেস্ট সম্পন্ন করা হয়েছে। গুঞ্জন রয়েছে, অন্তত ৬ জন ডোপ টেস্টে পজেটিভ প্রমাণিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরাসরি কোনও মন্তব্য করেননি পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, ‘ডোপ টেস্ট করছি সেটা সত্য। তবে কতজন করেছি বা করব সেটা এই মুহূর্তে বলছিনা। যখন এই কাজ শেষ হবে তখন সংবাদ সম্মেলন করেই বিস্তারিত জানানো হবে। আর তখন বিধিমতে পজেটিভ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

যোগ দিয়েই পুলিশ কমিশনার বলেছিলেন থানাই হবে পুলিশি সেবার মূল কেন্দ্রস্থল। সেজন্য প্রত্যেক থানাকে সিসিটিভির আওতায় এনে নিজ কক্ষ থেকে মনিটরিংয়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে কাজের অগ্রগতি কতটুকু জানতে চাইলে পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, ‘কাজটা নিয়ে আমি খুবই আগ্রহী। বাট যে প্রতিষ্ঠানকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সিসিএল কমিউনিকেশন তারাই মূলত টেকনিক্যাল কারণে দেরি করছে। তারা জানিয়েছে, তাদের কিছু ক্যাবল ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে কাটা পড়েছে। ক্যাবল সংযোগ শেষ হলেই ক্যামেরা স্থাপন কোনও বিষয়না। আশা করছি আগামী মাসেই এই মনিটরিং কার্যক্রম শুরু করতে পারব।’

সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনায় পুলিশের সোর্স নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। তারাও জড়িয়ে পড়েছে নানা অপরাধে। বিষয়টি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিএমপির শীর্ষ এ কর্মকর্তা বলেন, ‘যেহেতু কাগজে কলমে স্বীকৃত কোনও সোর্স রাখার নিয়ম নেই৷ তাই কেউ সুনির্দিষ্ট সোর্স বলা যাবে না বা সোর্স বলেও কেউ দাবি করতে পারবে না। আমি সিএমপিতে ক্রাইম জোনের ডিসিদের স্পষ্টই বলে দিব, কেউ যাতে সোর্স না পালে। এরকম হলে যদি কোনও সোর্স অপরাধ করে তার দায় ওই কর্মকর্তাকেও নিতে হবে। সোর্স পরিচয় দিলে তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।

আপনার মতামত লিখুন :